খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 15শে আশ্বিন ১৪৩২ | ৩০ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ছয় বছর বয়সী জারিফ আর তিন বছর বয়সী জায়ান, এই দুই ভাইয়ের মধ্যে বড়জন জারিফ মায়ের ধারণা কিছুটা বুঝলেও, ছোট জায়ানের কাছে ‘মা’ শব্দটি একেবারেই অচেনা। যখন জারিফের বন্ধুরা তাদের মায়েদের ভালোবাসা পায়, তখন ছয় বছরের শিশুটি কেবল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। অন্য শিশুরা যখন মায়ের কোলে ওঠে, তখন ছোট্ট ভাই জায়ানকে বুকে আগলে অসহায় চোখে চেয়ে থাকে জারিফ। তার চোখের চাহনিই প্রকাশ করে মাকে না পাওয়ার বেদনা কত গভীর।
গত বছরের ৩ ডিসেম্বর জারিফ-জায়ানের জননী, স্বর্ণপদকজয়ী শুটার সাদিয়া সুলতানা পরলোকগমন করেন। মায়ের আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত জারিফের কোমল হৃদয় ব্যথিত হয়। মায়ের মমতা পেতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে তার মন।
এই অবোধ দুই শিশু এখন নানার বাড়িতেই প্রতিপালিত হচ্ছে। নানা-নানি, খালা ও মামাদের স্নেহ-আদরেই কাটছে তাদের দিনকাল।
একসময় দৃঢ় হাতে রাইফেল ধরে দেশের জন্য স্বর্ণপদক এনেছিলেন শুটার সাদিয়া সুলতানা। ২০১০ সালের সাউথ এশিয়ান গেমস এবং কমনওয়েলথ শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপের এই স্বর্ণকন্যা বেশি দিন খেলা চালিয়ে যেতে পারেননি। একসময় তিনি মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেন। ২০১৭ সালে রান্নাঘরে এক অগ্নি দুর্ঘটনায় তার শরীরের ২৫ শতাংশ পুড়ে যায়। আগুনে তার বুক, পিঠ, ঘাড় এবং গালের এক অংশ ঝলসে গিয়েছিল।
তার শ্বাসনালীও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে কয়েক মাসের চিকিৎসায় দেহের ক্ষত শুকালেও, তার মনের গভীর ক্ষত দূর হয়নি। এই কৃতী শুটারকে মানসিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পুরো পরিবার একসঙ্গে চেষ্টা চালিয়েছিল।
কমনওয়েলথ শুটিংয়ে স্বর্ণ জেতার পর চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা (সিজেকেএস) সাদিয়াকে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতি কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। সাদিয়ার বাবা দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে সিজেকেএস-এ চাকরি করছেন এবং বর্তমানে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।
সৈয়দ সরওয়ার আলমের পাঁচ সন্তান— ছেলে-মেয়ে সবার জন্ম এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের কোয়ার্টারে। এখানেই তিনি প্রায় ৩১ বছর ধরে সপরিবারে বসবাস করেছেন। সাদিয়ার তিন ভাইও ব্যাডমিন্টন খেলেন।
সৈয়দ পরিবারের পাঁচ সন্তানই জাতীয় পর্যায়ে সুপ্রতিষ্ঠিত ক্রীড়াবিদ। তাদের মধ্যে তিনজনের হাত ধরে এসেছে আন্তর্জাতিক সাফল্য। ২০১০ যুব অলিম্পিকের উদ্বোধনী মার্চপাস্টে জাতীয় পতাকা বহন করার আগেই বৈশ্বিক আসরে সফলতার সোপান অতিক্রম করেছিলেন সাদিয়া। পাদপ্রদীপের আলোয় তিনি আসেন ঢাকা এসএ গেমসের মাধ্যমে। শারমিন আক্তার রত্না এবং তৃপ্তি দত্তকে (বর্তমানে তৃপ্তি কবির) সাথে নিয়ে ১০ মিটার এয়ার রাইফেল দলগত ইভেন্টে তিনি স্বর্ণপদক জিতেছিলেন।
শুধু সাদিয়া নন, সৈয়দ পরিবারের অন্য চারজন ক্রীড়াবিদও নিয়মিতভাবে নিজেদের আলো ছড়িয়েছেন; যা আজও অব্যাহত রয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনকে সাফল্যের আলোয় আলোকিত করা এই পরিবারকে ঘিরে রেখেছে গভীর বিষাদের মেঘ। সাদিয়ার প্রয়াণের পর মেঘে ঢাকা এই পরিবার কি কখনও ভোরের সোনালী আলোর দেখা পাবে? সাদিয়ার দুই ছেলেকে কোলে নিয়ে আফসোস করে সৈয়দ সাজ্জাদ বলেন, ‘এই বয়সে ওদের মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা পাওয়ার কথা ছিল। মায়ের হাতে খাবার খাওয়ার কথা ছিল।
মায়ের আঁচলের ছায়ায় আদর পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা হলো না। এমনকি সরকারের কাছ থেকে ওর মায়ের জন্য যা কিছু প্রাপ্য ছিল, সেটাও ওরা পায়নি। হয়তো এভাবেই মাতৃস্নেহ বঞ্চিত হয়েই ওদের বড় হতে হবে।’
খবরওয়ালা/টিএসএন