খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
লিনু হক
—একটি নাম, যা সাহস, সংগ্রাম, দেশপ্রেম এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক। তিনি রাজপথের একজন আপোষহীন লড়াকু সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত এক দৃঢ়চেতা বাঙালি নারী এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন একজন সুলেখিকা।
বাংলালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী গণমানুষের মুক্তির লড়াই—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষ অংশীদার। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একজন সাহসী ও আপোষহীন নেত্রী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন মাত্র দশম শ্রেণির ছাত্রী, কিন্তু বয়সকে অতিক্রম করে দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন অদম্য সাহসিকতায়।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, বেদনা, গৌরব ও নারীর অবদানের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি নিরলসভাবে লিখে চলেছেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘মেয়ে বিচ্ছু’ এবং ‘Girls of Gallantry: Azimpur 1971’ পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়। আজিমপুরের মুক্তিযোদ্ধা নারীদের সাহসিকতার কাহিনি নিয়ে রচিত এ গ্রন্থগুলো ইতিহাসের এক বেদনাময় অথচ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে নতুন করে তুলে ধরেছে।
পাঠকের ব্যাপক আগ্রহের কারণে তাঁর পুত্র ইরেশ হক পরবর্তীতে ‘মেয়ে বিচ্ছু’ গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ করেন, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এ ইতিহাসকে পরিচিত করে তুলতে সহায়ক হয়েছে।
১৯৫৫ সালের ১৫ জুন রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনিতে তাঁর জন্ম। পিতা কাজী ইউসুফ আলী এবং মাতা জোহরা বেগম। তাঁদের আদি নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নয়নপুর। পিতা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং কর্মরত ছিলেন এস্টাবলিশমেন্ট বিভাগে। আজিমপুর স্কুলেই তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন প্রয়াত লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডা. আব্দুল হামিদের সহধর্মিণী। তাঁদের দুই সন্তান নিজ নিজ মেধা ও যোগ্যতায় দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। পুত্র ইরেশ হক বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের আরলিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সহায়তায় পিএইচডি অর্জন করেন। পরে দীর্ঘ এক দশক মিজৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
কন্যা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সাউথহ্যাম্পটন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে নিউরোলজির কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। তিনি এ প্রতিষ্ঠানে এই মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত প্রথম বাংলাদেশি নারী চিকিৎসকদের অন্যতম।
নিজের জীবন-অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধারণ করে লিনু হক নিয়মিত লিখে চলেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাঁর লেখনী নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস, মানবিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে পরিচিত করছে এবং সমৃদ্ধ করছে পাঠকসমাজকে।
২০২৩ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত তাঁর তথ্যনির্ভর মূল্যবান গ্রন্থ ‘অবরুদ্ধ নগরের গেরিলা ’৭১’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্রে বাংলার নারী’ মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ও ইতিহাসচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
লিনু হকের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এটাই—তিনি যা বিশ্বাস করেন, তা-ই অনুশীলন করেন। তাঁর আদর্শ, নীতি, সাহস এবং স্পষ্টবাদিতা ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি কেবল একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা নন; তিনি ইতিহাসের একজন জীবন্ত সাক্ষী, সংগ্রামের এক উজ্জ্বল প্রতীক এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।
জন্মদিনের এই বিশেষ দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্পষ্টবাদী ও দৃঢ়চেতা লেখিকা লিনু হক-এর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অফুরন্ত শুভকামনা।
সুস্থ থাকুন, আলোকিত থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন। আপনার কলমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মানবিকতার বাণী এবং সত্যের দীপ্তি আরও বহুদূর ছড়িয়ে পড়ুক।
শুভ জন্মদিন, লিনু হক।