খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
ময়মনসিংহে নিখোঁজের ছয় দিন পর মাথা বিচ্ছিন্ন ও অর্ধগলিত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া যুবক সোহেল সরকার (২৫) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। পরকীয়ার সন্দেহে অনৈতিক সম্পর্কের জেরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মূল পরিকল্পনাকারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রোববার (২৬ জুলাই) দুপুরে গ্রেপ্তার আসামিদের বিচারকের সামনে হাজির করা হলে বিজ্ঞ আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এসব তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ।
গ্রেপ্তার চার আসামি হলেন—হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও সদর উপজেলার মীরকান্দাপাড়া গ্রামের মো. সেলিম মিয়া (৩০), তাঁর সহযোগে অংশ নেওয়া আবদুল কাদির ওরফে আল আমিন (২৫), মো. সেলিম ওরফে নাপিত সেলিম (৩২) এবং লাল চাঁন ওরফে লালু (২৬)।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তার চারজনই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। তিনি জানান, মূল অভিযুক্ত সেলিমের দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে নিহতের অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে—এমন গভীর সন্দেহ থেকেই সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত ১৬ জুলাই রাত সাড়ে আটটার দিকে ময়মনসিংহের নিজ বাসা থেকে বের হওয়ার পর সোহেল সরকার হঠাৎ নিখোঁজ হন। স্বজনেরা দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজি করে তাঁর কোনো সন্ধান না পেয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন। নিখোঁজের ছয় দিন পর, অর্থাৎ ২২ জুলাই বিকেলে স্থানীয় বাসিন্দারা অম্বিকাগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের মাঠ সংলগ্ন নির্জন এক বাগানে একটি অর্ধগলিত ও দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন।
খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযান চালায় এবং ওই এলাকারই আরেকটি স্থান থেকে মাটিচাপা দেওয়া মাথাবিহীন একটি লাশ উদ্ধার করে। পরবর্তী সময়ে লাশের পরনে থাকা জামাকাপড় ও জুতো দেখে পরিবার এটি সোহেলের মরদেহ বলে নিশ্চিত করে।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত সোহেলের বাবা নূরুল ইসলাম বাদী হয়ে গত শনিবার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা ও আলামত গুমের মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর পরই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের একটি যৌথ দল ভালুকা, ময়মনসিংহ সদর ও মীরকান্দাপাড়া এলাকায় টানা অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করে।
পরবর্তীতে আসামিদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঝোপঝাড় ও আশপাশের গোপন স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো দা, কোদাল, আসামিদের রক্তমাখা পোশাক এবং জুতাসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়।
আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পুলিশ জানায়, সম্পর্ক ও সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়েই এই ভয়াবহ অপরাধের সূত্রপাত। মূল অভিযুক্ত সেলিমের বোনের ভাশুর ছিলেন নিহত সোহেল। সেলিম পুলিশকে জানায়, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সোহেল বিগত প্রায় তিন মাস ধরে ঢাকায় গোপনে বসবাস করছিলেন। বিষয়টির খবর পেয়ে সেলিমের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম নেয় এবং তিনি সোহেলকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।
কৌশলে সোহেলকে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে ডেকে আনা হয়। এরপর ১৬ জুলাই রাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চারজন মিলে তাকে হত্যা করে ধারালো দা দিয়ে শরীরের মাথা ও ধড় আলাদা করে ফেলে। আলামত গুম ও পরিচিতি গোপন করার উদ্দেশ্যে লাশ ও মাথা আলাদা দুটি স্থানে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ কর্মকর্তা ওসি মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আসামিরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এবং মামলায় আইনগত সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আদালতে চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।