খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 30শে আশ্বিন ১৪৩২ | ১৫ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন, মঞ্চ ও সংস্কৃতি জগতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের অবদান আমাদের শিল্পযাত্রার মেরুদণ্ড হয়ে আছে—যাঁদের নাম হয়তো আজ ততটা উচ্চারিত হয় না, কিন্তু তাঁদের নিবেদন ও সৃজনশক্তি এখনো প্রবাহিত। ঠিক তেমনই এক নাম জামালউদ্দিন হোসেন—বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রকৌশলী, অভিনেতা, নির্দেশক ও সংগঠক। মঞ্চে এবং জীবনে, তিনি ছিলেন এক নীরব শিল্পযোদ্ধা।
১৯৪৩ সালের ১৪ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছাত্রজীবনে ছিলেন মেধাবী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট)। সেখানে তিনি যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করেন। এই সময়েই গড়ে ওঠে তাঁর আজীবনের বন্ধুত্ব ও সহপাঠী সম্পর্ক প্রখ্যাত অভিনেতা আবুল হায়াতের সঙ্গে।
জামালউদ্দিন হোসেন কেবল নাট্যকর্মীই ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। দেশের মুক্তির জন্য অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, আর স্বাধীনতার পর সেই একই নিষ্ঠায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন সংস্কৃতির মুক্তচিন্তার সংগ্রামে।
১৯৭৫ সালে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী নাট্যদল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে। ২০ বছর ধরে, অর্থাৎ ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত, তিনি এই দলের হয়ে অভিনয়, নির্দেশনা ও সংগঠনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত রাখেন। মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি ছিল গম্ভীর অথচ সংবেদনশীল—যেন চরিত্রের গভীরে ডুবে যাওয়া এক শিল্পীর নিবেদন।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার ভরসায় ১৯৯৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজের দল ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন অনসাম্বল’। এখানেও তিনি শুধু শিল্পী নয়, ছিলেন একজন সংগঠক, একজন পরামর্শদাতা। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি তরুণ শিল্পীদের গড়ে তোলার কাজ করেছেন নিঃস্বার্থভাবে।
জামালউদ্দিন হোসেন শুধু অভিনয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রেসিডিয়াম সদস্য, এবং বেতার টেলিভিশন শিল্পী সংসদের সাধারণ সম্পাদক।
সংস্কৃতি সংগঠনের নীতিনির্ধারণী পরিসরেও তাঁর প্রভাব ছিল লক্ষ্যণীয়।
তাঁর পরিচালিত ও অভিনীত কিছু উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটক হলো—খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, রাজা রাণী, চাঁদ বনিকের পালা, আমি নই, বিবিসাহেব, জুগলবন্দী
এই নাটকগুলোয় তিনি কেবল চরিত্র নির্মাণই করেননি, বরং দর্শকের চিন্তাজগতে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—যেমনটা একজন সত্যিকারের নাট্যকারীর কাজ।
১৯৭৫ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বিশিষ্ট অভিনেত্রী রওশন আরা হোসেনের সঙ্গে। তাঁদের পরিচয়ও নাটকের মঞ্চেই—নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে কাজ করতে গিয়েই দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর সম্পর্ক।
তাঁদের দুই সন্তান—ছেলে বর্তমানে কানাডা প্রবাসী, আর মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।
২০০৬ সালের পর থেকে দম্পতি যুক্তরাষ্ট্রে মেয়ের কাছে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সম্প্রতি তাঁরা কানাডায় ছেলের কাছে বেড়াতে যান। সেখানেই অসুস্থ হয়ে ভর্তি হন ক্যালগেরির রকিভিউ হাসপাতালে।
২০২৪ সালের ১১ অক্টোবর, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায়, শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই নাট্যপ্রাণ মানুষটি।
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে।
তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন হারালো এক নিবেদিতপ্রাণ, নীরব কিন্তু দৃঢ় শিল্পযোদ্ধাকে।
আজ তাঁর মঞ্চে আর আলো জ্বলে না, কিন্তু তাঁর কর্ম, তাঁর নাট্যদর্শন, তাঁর সংগঠকসত্তা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে অবিরত।
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ — অভিনেতা ও নাট্যব্যক্তিত্ব জামালউদ্দিন হোসেন (১৯৪৩–২০২৪) একজন প্রকৌশলী হয়েও যিনি আজীবন নির্মাণ করে গেছেন সংস্কৃতির ভিত।
খবরওয়ালা/এমএজেড