খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এবার সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে—এমন ইঙ্গিত মিলছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সাম্প্রতিক অবস্থান থেকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে সতর্ক করে জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সময় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে।
মার্কিন গণমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হোয়াইট হাউস ইতোমধ্যে ইরান সংক্রান্ত একটি সুপরিকল্পিত যুদ্ধ পরিকল্পনার চূড়ান্ত অনুমোদনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক বা ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ধ্বংস করা নয়; বরং দেশটির শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অকার্যকর করে দিয়ে সরকার পরিবর্তনের পথ সুগম করা। মার্কিন কৌশলবিদদের মতে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর নেতৃত্বকে আঘাত করতে পারলে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়বে এবং সাধারণ জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে পারে।
মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সম্ভাব্য অভিযানের অন্যতম বড় সমর্থক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বাস দিয়েছেন, ইরানে যদি রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে, তবে তেহরানে পশ্চিমাপন্থী নতুন সরকার গঠনে ইসরাইল সক্রিয় সহযোগিতা করবে। এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই ওভাল অফিসে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের দিকে বিশাল মার্কিন নৌবহর অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তার এই মন্তব্যের পর থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে নিজেদের আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে ইরানও কঠোর ভাষায় পাল্টা হুমকি দিয়েছে। দেশটির সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আক্রমিনিয়া বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত ও সীমিত আঘাতের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার স্বপ্ন দেখে, তবে তা মারাত্মক ভুল হিসাব হবে। তার ভাষায়, হামলা হলে যুদ্ধ শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অঞ্চলে অবস্থানরত প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা ও সামরিক ঘাঁটি ইরানি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের পরিস্থিতিতে ইরান ‘সীমিত প্রতিক্রিয়া’ নীতি থেকে সরে এসে বড় ধরনের জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানি সামরিক মহলের দাবি, প্রয়োজনে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে উল্লেখযোগ্য মানবিক ও সামরিক ক্ষতির মুখে ফেলতে সক্ষম।
যুদ্ধের এই উত্তপ্ত আবহের মধ্যেই কূটনৈতিক উদ্যোগও পুরোপুরি থেমে যায়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে তুর্কি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে জানিয়েছেন, তেহরান আলোচনার পথ খোলা রাখতে আগ্রহী। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, চাপ, নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক হুমকির মুখে ইরান তার প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে কোনো আপস করবে না।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সামরিক প্রস্তুতি মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় পুরো অঞ্চল এখন কার্যত এক বিস্ফোরক আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে।
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| সম্ভাব্য হামলাকারী | যুক্তরাষ্ট্র |
| লক্ষ্যবস্তু | ইরানের পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ও শীর্ষ নেতৃত্ব |
| আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া | সৌদি আরব ও ইউএই আকাশসীমা ব্যবহারে অনাগ্রহী |
| ইরানের হুমকি | আঞ্চলিক যুদ্ধ, মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা |
| কূটনৈতিক চেষ্টা | তুরস্কের মাধ্যমে আলোচনার উদ্যোগ |
এই টানটান পরিস্থিতিতে পরবর্তী কয়েকটি দিনই নির্ধারণ করে দিতে পারে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির পথে যাবে, নাকি নতুন এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে।