খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 4শে ফাল্গুন ১৪৩১ | ১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কাজী আরেফ আহমেদসহ ৫ জাসদ নেতার ২৬তম হত্যা দিবস আজ। এ দিবস উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা এবং শহীদের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছে জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটি।
কমিটির উদ্যোগে আজ রবিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৬টায় দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন এবং সকাল ৯টায় রাজধানীর মিরপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থানে শহীদ কাজী আরেফ আহমেদের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। তারপর বেলা ১১টায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে কর্নেল তাহের মিলনায়তনে আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়।
১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ আজ এই দিনে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কালিদাসপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় বক্তৃতাকালে চরমপন্থি সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জাসদের তৎকালীন কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আরেফ আহমেদ, কুষ্টিয়া জেলা জাসদের তৎকালীন সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা লোকমান হোসেন, জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট ইয়াকুব আলী, স্থানীয় জাসদ নেতা ইসরাইল হোসেন ও শমসের মন্ডল নিহত হন। এজন্যে এদিনকে কাজী আরেফ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে জাসদ।
জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা শফিউদ্দিন মোল্লার সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য শরিফুল কবির স্বপনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক শওকত রায়হান, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোহসীন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর রহমান চুন্নু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মীর্জা মো. আনোয়ারুল হক, ছাত্রলীগ(বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র) কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ আহমেদ, জাসদ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন প্রমুখ।
সভায় বক্তারা বলেন, কাজী আরেফ আহমেদ বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে ধ্রুবতারা। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অবদান রেখেছেন। ১৯৬২ সালে সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত স্বাধীনতার নিউক্লিয়াসের সদস্য হিসাবে মাত্র ১৯ বছর বয়সে কাজী আরেফ আহমেদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে পূর্ব বাংলার বাঙালি ও আদিবাসীদের জাতীয় মুক্তি সম্ভব না, তাই পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর কাজী আরেফ আহমেদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, সদ্যস্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গঠন ও পুনর্গঠন করতে হলে দলীয় সরকারের বদলে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা জাতীয় ঐক্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বিপ্লবী জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বঙ্গবন্ধুর সাথে রাজনৈতিক আদর্শগত মতবিরোধে ক্ষমতার অংশীদারত্ব ত্যাগ করে দেশের প্রথম বিরোধী দল জাসদ গঠন করেন এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী শক্তি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে দেশে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনীতি চাপিয়ে দিলে কাজী আরেফ আহমেদ এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের গভীরতা অনুধাবন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ রাজনৈতিক তত্ত্ব বিনির্মাণ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের কৌশল প্রয়োগ করেন।
বক্তারা আরও বলেন, কাজী আরেফ আহমেদ ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নেতৃত্ব সিপাহি জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। কিন্তু জিয়ার বিশ্বাসঘাতকতায় সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। এরপর কাজী আরেফ আহমেদ সামরিক শাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে বাম ঐক্যের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিসহ সামরিক শাসন বিরোধী শক্তির বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কাজী আরেফ আহমেদ ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসন বিরোধী গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন এবং গণঅভ্যুত্থানের কাছে সামরিক শাসকদের পরাজিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কাজী আরেফ আহমেদ বিশ্বাস করতেন যে, বাংলাদেশের জন্মশত্রু পাকিস্তানপন্থার রাজনীতির দুর্গে আঘাত হানতে এবং জাতির উপর সংঘটিত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধ যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে হব। কাজী আরেফ আহমেদ তার এই বিশ্বাস ও তাত্ত্বিক অবস্থান থেকেই ১৯৯২ সালে শহীদ জাহানারা ইমাম, আবদুর রাজ্জাকসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তিসমূহকে সংগঠিত করে ঐতিহাসিক গণআদালত গঠন এবং গণআদালতের গণরায় বাস্তবায়নে গণআন্দোলন গড়ে তোলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কাজী আরেফ আহমদে তার বিনির্মিত এই মৌলিক তত্ত্বগুলি এবং সেগুলি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতির আকাশে ধ্রুবতারায় পরিণত হয়েছিলেন।
বক্তারা বলেন, দুর্ভাগ্যক্রমে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভাবাদর্শ বিরোধী শক্তি ক্ষমতা দখল করে দেশে এখন সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী মবতান্ত্রিক শাসন কায়েম করেছে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে ১৯৬২ সালে কাজী আরেফ আহমেদ যেমন মাত্র ১৯ বছর বয়সে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে দুঃসাহসিক রাজনৈতিক অভিযান শুরু করেছিলেন, আজকের তরুণদের কাজী আরেফ আহমেদের মতই তারুণ্যের শক্তি নিয়ে অতীতের গৌরবোজ্জ্বল বিভিন্ন সংগ্রামের পোড়খাওয়া নেতা-কর্মীদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একটি অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
বক্তারা জাসদের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের প্রতি কাজী আরেফের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রতিষ্ঠা এবং জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ইউনূস সরকারের প্রতিহিংসার ফাঁসির দড়ি থেকে মুক্ত করার বিষয়টি একইসূত্রে গাঁথা।
খবরওয়ালা/আরডি