খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 6শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ১৯ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হরমুজ প্রণালি নিয়ে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাপ্তি এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই কৌশলগত নৌপথের ওপর তেহরান পূর্ণ নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে।
ইরানের নিরাপত্তা কাউন্সিলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নৌপথটি ব্যবহারকারী সকল বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী জাহাজের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। নতুন এই নির্দেশনার আওতায় ইরান মূলত তিনটি প্রধান বিষয় কার্যকর করতে যাচ্ছে:
১. পূর্ণ তথ্য সংগ্রহ: প্রণালি অতিক্রমকারী প্রতিটি জাহাজকে তাদের গন্তব্য, কার্গোর ধরন এবং মালিকানা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে।
২. ট্রানজিট সনদ প্রদান: ইরানি জলসীমা বা প্রভাবাধীন এলাকা দিয়ে যাতায়াতের জন্য জাহাজগুলোকে বিশেষ ট্রানজিট পারমিট বা সনদ সংগ্রহ করতে হবে।
৩. সেবা ফি আদায়: নৌপথের নিরাপত্তা এবং আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনার অজুহাতে প্রতিটি জাহাজ থেকে নির্দিষ্ট হারে ‘সেবা ফি’ বা শুল্ক আদায় করা হবে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোর একটি। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই সংকীর্ণ জলপথটির গুরুত্ব অপরিসীম। নিচে এই প্রণালি সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| ভৌগোলিক অবস্থান | ওমান এবং ইরানের মধ্যবর্তী সংযোগস্থল। |
| দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ | দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৬১ কিলোমিটার; সংকীর্ণতম অংশে প্রস্থ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার। |
| জ্বালানি প্রবাহ | বিশ্বের মোট উত্তোলিত খনিজ তেলের প্রায় ২০-৩০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। |
| দৈনিক তেলের পরিমাণ | গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে রপ্তানি করা হয়। |
| নির্ভরশীল দেশসমূহ | সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার। |
ইরানের এই ঘোষণার ফলে বিশ্ব বাজারে তেলের দামে অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। যেহেতু বিশ্বের লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (LNG) সরবরাহের একটি বড় অংশও এই পথ দিয়ে আসে, তাই এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদী হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, অবাধ নৌচলাচলের অধিকার থাকলেও ইরান তার ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়ে এবং জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে এই কড়াকড়ি আরোপ করছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জোর দিয়ে বলেছে যে, এই ব্যবস্থা কোনো সাময়িক পদক্ষেপ নয়, বরং স্থায়ী শান্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকবে।
ইরানের এই সিদ্ধান্তকে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ মানে হলো বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় অংশের চাবিকাঠি হাতে রাখা। অতীতেও বিভিন্ন উত্তেজনার সময় ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বা নিয়ন্ত্রণ করার হুমকি দিয়েছিল, তবে এবারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং ‘সেবা ফি’ আদায়ের বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যায় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানের এই নতুন ট্রানজিট নীতির প্রতি কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা। আপাতত, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার শর্ত দিয়ে ইরান এই কৌশলগত জলপথে নিজেদের অবস্থানকে আইনি ও প্রশাসনিকভাবে সুসংহত করার পথেই হাঁটছে।