খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
সমগ্র দেশজুড়ে বর্তমানে এক অভূতপূর্ব ও তীব্র তাপপ্রবাহ বিরাজ করছে, যা সর্বস্তরের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে স্থবির করে তুলেছে। এই প্রচণ্ড তাপদাহের সঙ্গে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বা আর্দ্রতা অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় দিনভর এক অসহ্য ও গুমোট গরম অনুভূত হচ্ছে। চলমান এই চরম আবহাওয়ার কারণে মানবদেহে মারাত্মক পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, খিঁচুনি এবং হিটস্ট্রোকের মতো জীবননাশী স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন প্রবল হচ্ছে, তেমনি গ্রীষ্মের তীব্র গরমে অসচেতনতাবশত দূষিত পানি পানের ফলে ডায়রিয়া, বমি, টাইফয়েড ও জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা যখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে, তখন মানুষের শরীরে হিটস্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এর পরিবেশিত তথ্যানুযায়ী, বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক তাপমাত্রা যখন ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়ে যায় এবং এই অবস্থা একটানা দুই দিনেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়, তখন সেই তাপপ্রবাহকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপর্যয়কর হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন না করলে তা মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
তীব্র এই তাপদাহে কম-বেশি দেশের সকল মানুষ শারীরিক কষ্টের সম্মুখীন হলেও চিকিৎসকদের মতে নিম্নোক্ত নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণি ও পেশার মানুষ সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন:
| ক্রমিক সংখ্যা | ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী | সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি ও তার কারণ |
| ১ | উন্মুক্ত স্থানের কায়িক শ্রমজীবী | রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, কৃষক এবং নির্মাণশ্রমিক যারা সরাসরি খোলা আকাশের নিচে রোদে দীর্ঘক্ষণ কঠোর পরিশ্রম করেন। |
| ২ | সংবেদনশীল সাধারণ মানুষ | গর্ভবতী নারী, নবজাতক শিশু, প্রসূতি মা, বয়োবৃদ্ধ মানুষ এবং শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি। |
| ৩ | দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগী | যারা আগে থেকেই হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র (ডায়াবেটিস) কিংবা ফুসফুসের বিভিন্ন ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন। |
| ৪ | গৃহকর্মী ও ইনডোর কর্মী | যারা ঘরের ভেতরে বা কারখানায় অত্যন্ত বদ্ধ, উত্তপ্ত ও বায়ু চলাচলের অনুপযোগী পরিবেশে কিংবা রান্নাঘরে চুলার পাশে কাজ করেন। |
তীব্র গরমের মধ্যে কাজ করার সময় বা চলাফেরার ক্ষেত্রে শরীরে কিছু সুনির্দিষ্ট নেতিবাচক লক্ষণ দেখা দিলে সেটিকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। চিকিৎসকদের মতে, এগুলো হলো তীব্র তাপজনিত অসুস্থতা বা হিটস্ট্রোকের পূর্ব লক্ষণ। এই লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো— গায়ের চামড়া অতিরিক্ত গরম ও লালচে হয়ে যাওয়া, তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরানো এবং বমি বমি ভাব বা সরাসরি বমি হওয়া। এছাড়া চরম গরমের মধ্যেও হঠাৎ করে শরীর ঘামানো বন্ধ হয়ে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি লক্ষণ। এর পাশাপাশি প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া বা প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যাওয়া, চোখে ঝাপসা বা অন্ধকার দেখা, বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনের গতি অত্যন্ত দ্রুত হওয়া, মানসিক বিভ্রান্তি দেখা দেওয়া, উন্মাদের মতো আচরণ করা কিংবা হঠাৎ করে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়া।
দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ এই উদ্ভূত পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে জানান যে, প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত ঘামের মাধ্যমে মানবশরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ উপাদান বেরিয়ে যায়। এর ফলে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া, প্রচণ্ড দুর্বলতা ও মারাত্মক পানিস্বল্পতা দেখা দেয়। এই পানিস্বল্পতাকে অবহেলা করলে মানুষের মস্তিষ্ক অচল হয়ে রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে এবং মানুষের কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হওয়ার মতো জটিলতর স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটতে পারে। এছাড়া সরাসরি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ত্বকে ফোসকা পড়া বা ত্বক লাল হয়ে যাওয়ার মতো ‘সান বার্ন’ এবং ঘাম ও ময়লা জমে ত্বকে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকজনিত সংক্রমণের আশঙ্কাও বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
যদি কোনো ব্যক্তি অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েন বা হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হন, তবে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে তাকে দ্রুত কোনো ছায়াযুক্ত শীতল স্থানে নিয়ে যেতে হবে এবং ফ্যান বা অন্য কিছু দিয়ে বাতাস করতে হবে। একই সঙ্গে একটি ভেজা কাপড়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে তার পুরো শরীর ভালোভাবে মুছে দিতে হবে এবং চোখে-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিতে হবে। রোগীর অবস্থা গুরুতর মনে হলে কোনো প্রকার কবিরাজি বা ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর না করে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বিশেষভাবে তাগিদ দিয়েছেন।
তীব্র তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেকে ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সুরক্ষিত রাখতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) কিছু জরুরি পালনীয় এবং বর্জনীয় নিয়ম মেনে চলার জোরালো সুপারিশ করেছে:
যাবতীয় শিক্ষণীয় করণীয়সমূহ:
তীব্র ও কড়া রোদের সময় যথাসম্ভব বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকুন এবং জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হলে অবশ্যই ছাতা, টুপি ব্যবহার করুন বা সুনির্দিষ্ট কাপড়ে মাথা ঢেকে রাখুন।
রোদের মধ্যে কাজ করার সময় বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের মাঝে মাঝে কিছুক্ষণের জন্য ছায়াযুক্ত বা শীতল স্থানে গিয়ে বিশ্রাম গ্রহণ করুন।
শরীরে সহজে বাতাস চলাচলের সুবিধার্থে ঢিলেঢালা, হালকা রঙের সুতি ও আরামদায়ক পোশাক পরিধান করুন।
শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করতে তৃষ্ণা না লাগলেও সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ, বিশুদ্ধ ও জীবাণুমুক্ত পানি পান করুন।
নিয়মিতভাবে প্রতিদিন গোসল করুন এবং চোখে-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে শরীরকে সবসময় শীতল রাখার চেষ্টা করুন।
সহজে পরিপাক বা হজম হয় এমন পুষ্টিকর, টাটকা ও হালকা খাবার গ্রহণ করুন। শরীরের লবণের ঘাটতি মেটাতে মুখে খাওয়ার স্যালাইন, ডাবের পানি ও টাটকা ফলের ঘরে তৈরি শরবত পান করুন।
যাবতীয় বর্জনীয় বিষয়সমূহ:
বাসি, পচা, নোংরা এবং অতিরিক্ত তেল ও মসলাযুক্ত গুরুপাক খাবার খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ পরিহার করুন।
সরাসরি তীব্র রোদের মধ্যে একটানা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো প্রকার কঠোর শারীরিক বা কায়িক পরিশ্রম করা থেকে বিরত থাকুন।
রাস্তার পাশে খোলা অবস্থায় বিক্রি হওয়া অনিরাপদ পানি, শরবত, বরফ এবং কৃত্রিম রং বা কেমিক্যাল মিশ্রিত ঠান্ডা পানীয় খাওয়া সম্পূর্ণরূপে বর্জন করুন।
সবশেষে, আইসিডিডিআর,বি তাদের বিশেষ নির্দেশনায় জানিয়েছে যে, পরিবারের শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি এই সময়ে বিশেষ যত্নশীল হতে হবে। ঘরের পরিবেশ যাতে অতিরিক্ত উত্তপ্ত না হয়ে যায়, সেজন্য ঘরের জানালা খুলে রেখে বা ফ্যান চালিয়ে সার্বক্ষণিক বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।