খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় এক রাতে সশস্ত্র ডাকাত দলের ধারাবাহিক হামলায় কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড সাকিব হাছান খাঁনসহ মোট ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন। একই রাতে ডাকাত দলটি পার্শ্ববর্তী আরেকটি আবাসিক বাড়িতে হানা দিয়ে অস্ত্রের মুখে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে নগদ টাকা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুক্রবার (১৯ জুন) দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে আড়াইহাজার উপজেলার হাইজাদী ইউনিয়নের ধন্দী এবং রাইনাদী-আতাদী এলাকায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও বর্বরোচিত ডাকাতির ঘটনা দুটি ঘটে।
পারিবারিক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, আড়াইহাজার উপজেলার হাইজাদী ইউনিয়নের ধন্দী গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা সাকিব হাছান খাঁন, যিনি বর্তমানে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন, তিনি ছুটিতে নিজের গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। শুক্রবার দিবাগত রাতে ওই এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার কারণে তীব্র গরমে তিনি তাঁর কয়েকজন বন্ধুর সাথে বাড়ির অদূরে রাস্তার পাশে ফাঁকা জায়গায় বসে সময় কাটাচ্ছিলেন।
রাত আনুমানিক ১টার দিকে হঠাৎ করেই ১০ থেকে ১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ সশস্ত্র ডাকাত দল দেশীয় ও ধারালো অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ওই স্থানে হানা দেয় এবং সেখানে অবস্থানরত ব্যক্তিদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। ডাকাত দলের সদস্যরা তাদের কাছে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সেখানে উপস্থিত লোকজনকে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে।
ডাকাতদের এই আকস্মিক ও বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁনসহ তাঁর সাথে থাকা মুকুল (৩৮), রাজিব (৩২), রুবেল (৩৬), ফারুক (৩২) এবং মুকুলের স্ত্রী ডালিয়া (৩৩) মারাত্মকভাবে জখম ও গুরুতর আহত হন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের আর্তচিৎকার এবং শোরগোল শুনে আশেপাশের বাড়ির লোকজন ও প্রতিবেশীরা লাঠিসোটা নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে আসেন।
সাধারণ গ্রামবাসীদের সংগঠিত হয়ে এগিয়ে আসতে দেখে ডাকাত দলের সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দারা রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় ওই ছয়জনকে উদ্ধার করে অনতিবিলম্বে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা আহতদের প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে তাদের আঘাতের গভীরতা বিবেচনা করে এবং উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে রাতেই তাদের জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ধন্দী গ্রামে এসিল্যান্ড ও তাঁর বন্ধুদের ওপর হামলা চালানোর ঘটনার ঠিক এক ঘণ্টা পর, একই সশস্ত্র ডাকাত দল পার্শ্ববর্তী রাইনাদী-আতাদী এলাকায় প্রবেশ করে। সেখানে তারা সুমন নামের এক স্থানীয় বাসিন্দার বসতবাড়িতে হানা দেয়। ডাকাতেরা সুমনের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং অস্ত্রের মুখে পরিবারের সকল সদস্যকে জিম্মি করে প্রাণনাশের হুমকি দেয়।
এরপর ডাকাত দল পুরো ঘরে ব্যাপক তল্লাশি ও তাণ্ডব চালিয়ে আলমারিতে রক্ষিত নগদ ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং নারীদের পরিহিত ও সংরক্ষিত থাকা প্রায় ১৪ ভরি ওজনের বিভিন্ন ধরনের স্বর্ণালংকার সম্পূর্ণ লুট করে নিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। পরপর দুটি গ্রামে একই রাতে এমন সুসংগঠিত ডাকাতির ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে।
আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সবজেল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, ডাকাতি ও হামলার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ধন্দী ও রাইনাদী-আতাদী এলাকার ঘটনাস্থল দুটি পরিদর্শন করেছে। ডাকাতদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সহকারী কমিশনারসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে প্রথম হামলার স্থানটিতে ডাকাতেরা আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোনো ধরনের মালামাল বা মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিতে পারেনি বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি আরও জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ বা এজাহার প্রাপ্তি সাপেক্ষেই নিয়মিত মামলা রুজু করা হবে এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই বিষয়ে আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুর রহমান জানান, ডাকাত দলটি প্রথম আক্রমণস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় মূলত যাকে সামনে পেয়েছে, তাকেই কুপিয়ে জখম করে পালানোর চেষ্টা করেছে। হামলার শিকার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁন মূলত বুকে মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ শেষে বর্তমানে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছেন। এই ঘটনার সাথে জড়িত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে ও গ্রেপ্তার করতে স্থানীয় থানা পুলিশ তৎপরতার সাথে কাজ করছে।