খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 8শে কার্তিক ১৪৩২ | ২৩ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মাত্র সাত মিনিট। এই অল্প সময়েই একদল দুঃসাহসী চোর আধুনিক শিল্প ইতিহাসের অন্যতম বড় চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে। প্যারিসের বিশ্ববিখ্যাত ল্যুভর জাদুঘর থেকে নেপোলিয়ন যুগের মূল্যবান রত্ন চুরির ঘটনা ইতোমধ্যেই জেনে গেছে বিশ্ববাসী।
শনিবার সকাল, জাদুঘর তখন দর্শনার্থীতে পূর্ণ।
ঠিক সেই সময় মুখোশ পরা কয়েকজন ব্যক্তি জাদুঘরের নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে চুরি করে নিয়ে যায় রাজকীয় গয়নার একটি সংগ্রহ। যার মধ্যে ছিল নেপোলিয়ন বোনাপার্টের দ্বিতীয় স্ত্রী মেরি লুইজের এক জোড়া পান্নার নেকলেস ও কানের দুল।
চুরির পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, কিভাবে এমন এক কড়া নিরাপত্তা বেষ্টিত স্থানে এভাবে গয়না চুরি করা সম্ভব? তবে আসল সত্য, ল্যুভর যাদুঘরে চুরির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে একে একে সাত বারের বেশি চুরি হয়েছে ফরাসি এই শিল্পের আঁতুড়ঘরে।
১৯১১ সালের বিখ্যাত ‘মোনালিসা’ চুরি
২১ আগস্ট, ১৯১১। ইতালির ভিনসেনজো পেরুজিয়া নিজের পুরনো কর্মীর পোশাক পরে ল্যুভরে ঢোকেন নির্ভয়ে। দেয়ালে ঝোলানো লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ পেইন্টিংটি খুলে নিয়ে বেরিয়ে যান সদর দরজা দিয়েই! এরপর ২৪ ঘণ্টা পরেও কেউ টের পায়নি চিত্রটি উধাও হয়েছে।
আসলে প্রায়ই রক্ষণাবেক্ষণ বা ফটোগ্রাফির জন্য চিত্রকর্মগুলো সরানো হতো গ্যালারি থেকে।
আগে যাদুঘরে ফ্রেম ও কেস তৈরির কাজে যুক্ত থাকা পেরুজিয়া তাই জানতেন কখন কিভাবে চিত্রকর্ম সরাতে হবে। চুরি যাওয়ার একদিন পরে গ্যালারির কাজ করার সময় ধরা পরে মোনালিসা তার জায়গায় নেই।
দুই বছর পর, ১৯১৩ সালে, পেরুজিয়া ছবিটি আরেকটি যাদুঘরে বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়েন। তার দাবি ছিল জন্মভূমি ইতালির প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি এই চুরি করেছিলেন। এই ‘দেশপ্রেমিক’ চুরিই শেষ পর্যন্ত মোনালিসাকে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রে পরিণত করে।
মজার বিষয়, তদন্তের সবচেয়ে অদ্ভুত মোড়গুলোর মধ্যে একটি ছিল তরুণ পাবলো পিকাসোকে জিজ্ঞাসাবাদ করা। কয়েক বছর আগে জাদুঘর থেকে চুরি হওয়া একজোড়া প্রাচীন আইবেরিয়ান মূর্তির মাথা কিনেছিলেন তিনি। মোনালিসা মামলার সময় বিচারের ভয়ে তিনি সেগুলো পুলিশের কাছে সমর্পণ করেছিলেন।
নাৎসি দখলের সময়
১৯৪০ সালে জার্মান নাৎসি বাহিনীর দখলের সময়ও ল্যুভরের বিপুল শিল্পসংগ্রহ বিপন্ন হয়েছিল। তবে জাদুঘরের পরিচালক জ্যাক জোজার্দ আগেই প্রায় ১ হাজার ৮০০ বাক্স মূল্যবান শিল্পকর্ম সরিয়ে নিয়ে যান। ফলে নাৎসিরা প্যারিসে প্রবেশের পর প্রায় ফাঁকা জাদুঘরই দেখতে পায়।
তবুও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকর্ম—যেমন মুরিলোর ‘দ্য ইম্যাকুলেট কনসেপশন অফ লস ভেনেরেবলস’ নাৎসিদের হাতে পড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও লুভরকে তাড়া করেছে চুরির অভিশাপ।
১৯৬৬ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের এক জাদুঘর থেকে ফিরিয়ে আনার পথে কিছু প্রাচীন গয়না উধাও হয়ে যায়। পরে সেগুলো নিউইয়র্কের এক মুদি দোকানের ব্যাগ থেকে উদ্ধার হয়।
১৯৭৬ সালে, দু’বার চুরি ঘটে। জানুয়ারিতে চুরি হয় এক ফ্লেমিশ চিত্রকর্ম। এরপর ডিসেম্বরে মুখোশধারীরা দ্বিতীয় তলায় উঠে নিয়ে যায় রাজা শার্ল দশমের অলংকারখচিত তলোয়ার—যা আজও নিখোঁজ।
১৯৯০ সালে, দিনের আলোয় রেনোয়ার-এর একটি চিত্রসহ প্রাচীন রোমান গয়না উধাও হয়। একই সঙ্গে আরো কয়েকটি চিত্রকর্মও খোয়া যায়।
১৯৯৮ সালে, ক্যামিল কোরোর একটি চিত্রকর্ম ফ্রেম থেকে কেটে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেটিও আর উদ্ধার করা যায়নি।
২০২৫ সালে এসে নেপোলিয়নের রত্ন চুরি
এবারের ঘটনার পর ইতোমধ্যে ফ্রান্সজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত নেপোলিয়ন তার স্ত্রী ইউজেনিকে উপহার দেওয়া একটি ভাঙা পান্না-হীরের মুকুট উদ্ধার হয়েছে। বাকিগুলোর কোনো সন্ধান মেলেনি।
তবে ইতিহাস বলছে, হারিয়ে যাওয়া শিল্পকর্মের ফেরার সম্ভাবনা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। ১৯৮৩ সালে চুরি হওয়া এক ইতালীয় রেনেসাঁ যুগের বর্ম ২০২১ সালে ফ্রান্সের এক পরিবারের সংগ্রহ থেকে উদ্ধার করা হয়।
খবরওয়ালা/এমএজেড