খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 11শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২৩ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বর্তমানে একটি জটিল আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে অভিযুক্তদের আটকে রাখার বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব কার্যবিধির সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে। আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক মানদণ্ড সমুন্নত রাখার স্বার্থে এই আটক নীতি এখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব কার্যবিধির ৯(৫) ধারা অনুযায়ী, তদন্তাধীন অবস্থায় কোনো আসামিকে এক বছরের বেশি সময় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া আটকে রাখা যায় না। এই বিধির কাঠামো অত্যন্ত স্পষ্ট:
সময়সীমা: গ্রেপ্তারের ১২ মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।
জামিন: নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না হলে আসামি শর্তসাপেক্ষে জামিন পাওয়ার যোগ্য হবেন।
ব্যতিক্রম: কেবল বিশেষ ও ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে’ লিখিত কারণ দর্শানোর মাধ্যমে আদালত এই মেয়াদ আরও সর্বোচ্চ ৬ মাস বৃদ্ধি করতে পারেন।
ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তিনি পূর্ণ ১৫ মাস ধরে অভিযোগ গঠন ছাড়াই আটক রয়েছেন। একইভাবে সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ আরও অন্তত সাতজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই একই পরিস্থিতির শিকার। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে কোনো ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির’ লিখিত ব্যাখ্যা বা যুক্তি জনসমক্ষে আনা হয়নি, যা আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।
বর্তমানে অভিযোগ গঠন ছাড়াই এক বছরের বেশি সময় ধরে আইসিটির মাধ্যমে আটক থাকা ব্যক্তিদের একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | নাম | পূর্বতন পরিচয়/পদবি | আটক সময়কাল (আনুমানিক) |
| ১ | ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী | সাবেক উপদেষ্টা (বিদ্যুৎ ও জ্বালানি) | ১৫ মাস+ |
| ২ | ডা. দীপু মনি | সাবেক সমাজকল্যাণ ও শিক্ষামন্ত্রী | ১ বছর+ |
| ৩ | ফারুক খান | সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী | ১ বছর+ |
| ৪ | শাহজাহান খান | সাবেক নৌ-পরিবহন মন্ত্রী | ১ বছর+ |
| ৫ | গোলাম দস্তগীর গাজী | সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী | ১ বছর+ |
| ৬ | ফজলে করিম চৌধুরী | সাবেক সংসদ সদস্য | ১ বছর+ |
| ৭ | শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক | সাবেক বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্ট | ১ বছর+ |
যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত আইনজীবী লর্ড কার্লাইল কেসি এই বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছেন। তার মতে, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তিনি সতর্ক করেছেন যে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে বাংলাদেশ কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিচারিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়তে পারে। তার মতে, “প্রমাণ আছে বলা আর সেই প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা এক বিষয় নয়।” অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরও স্বচ্ছ এবং ন্যায্য বিচারিক প্রক্রিয়া প্রত্যাশা করে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে প্রতিশোধমূলক বিচারের আকাঙ্ক্ষা দেখা গেছে। রাজনৈতিকভাবে ‘ফ্যাসিস্ট’ বা ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ বিদ্যমান। তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বিচারিক ন্যায্যতাকে প্রভাবিত করা উচিত নয়। আইনের চোখে সবাই সমান, এবং যথাযথ প্রক্রিয়া (Due Process) অনুসরণ না করলে বিচার প্রক্রিয়াটি বিশ্বস্ততা হারাবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি দেশ পরিচালনায় ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করেছেন, তার প্রথম পরীক্ষা হতে পারে এই বিচারিক প্রক্রিয়াগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধির ৯(৫) ধারা কেবল একটি কাগুজে নিয়ম নয়, এটি ন্যায়বিচারের ভিত্তি। সুতরাং, যারা এক বছরের বেশি সময় ধরে অভিযোগহীন অবস্থায় আটক আছেন, তাদের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের উচিত হয় দ্রুত অভিযোগ গঠন করা, অন্যথায় আইনের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের জামিন প্রদান করা। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।