খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) দীর্ঘ সময় অবস্থানকালীন একঘেয়েমি কাটাতে এবং সহকর্মীদের আনন্দ দিতে এক ব্যতিক্রমী কৌতুকের আশ্রয় নিয়েছিলেন নাসার মার্কিন নভোচারী স্কট কেলি। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের দিকে তিনি প্রায় এক বছর মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করেন। সেই সময় তাঁর মন ভালো রাখতে একটি অদ্ভুত পরিকল্পনা করেন তাঁর যমজ ভাই এবং নাসার সাবেক নভোচারী মার্ক কেলি। ২০২২ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৬২ বছর বয়সী স্কট কেলি মহাকাশে ঘটে যাওয়া সেই রোমাঞ্চকর ও হাস্যরসাত্মক ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন।
স্কট কেলির ভাষ্যমতে, মহাকাশ স্টেশন থেকে একদিন ফোনে কথা বলার সময় তাঁর ভাই মার্ক কেলি (যিনি বর্তমানে অ্যারিজোনার একজন সিনেটর) তাঁকে মহাকাশে একটি গরিলার পোশাক বা স্যুট পাঠানোর প্রস্তাব দেন। মার্ক রসিকতা করে বলেছিলেন যে, এর আগে মহাকাশে কখনো কোনো গরিলা যায়নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মার্ক কেলি গরিলার পোশাকটি ভ্যাকুয়াম প্যাক করে বাতাস বের করে সংকুচিত করেন এবং ২০১৫ সালের জুনে স্পেসএক্স (SpaceX)-এর একটি মনুষ্যবিহীন কার্গো রকেটে করে সেটি মহাকাশ স্টেশনের উদ্দেশ্যে পাঠান। তবে প্রথম প্রয়াসটি সফল হয়নি, কারণ রকেটটি মাঝ আকাশেই বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
রকেট দুর্ঘটনার পর মার্ক কেলি দমে না গিয়ে দ্বিতীয়বার আরেকটি গরিলা স্যুট পাঠান এবং এবার তাঁর চেষ্টা সফল হয়। পোশাকটি অক্ষত অবস্থায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছায়।
পোশাকটি হাতে পাওয়ার পর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্কট কেলি গরিলা সেজে একটি ভিডিও তৈরি করেন এবং তা টুইটারে (বর্তমানে এক্স) পোস্ট করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, স্কট কেলি একটি বড় সাদা ব্যাগ থেকে আচমকা গরিলার বেশে বেরিয়ে এসে ব্রিটিশ নভোচারী টিম পিককে তাড়া করছেন এবং শূন্য অভিকর্ষের (জিরো গ্র্যাভিটি) কারণে টিম পিক ভেসে ভেসে পালিয়ে যাচ্ছেন।
পরবর্তীতে এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এই ভিডিওর ১৫ সেকেন্ডের একটি অংশ শেয়ার করেন, যেখানে ভুলবশত উল্লেখ করা হয়েছিল যে পোশাকটির ভেতরে মার্ক কেলি ছিলেন। ইন্টারনেটে প্রকাশের পর ভিডিওটি ব্যাপক সাড়া জাগায়, যার পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিসংখ্যান ও উপাত্ত |
| মোট ভিউ (ভিডিওটি দেখার সংখ্যা) | ৯০ লাখের (৯ মিলিয়ন) বেশিবার |
| মোট লাইক সংখ্যা | ৩ লাখ ৫০ হাজারের (৩.৫ লাখ) বেশি |
| মোট রিটুইট সংখ্যা | ৭৫ হাজারের বেশি |
| ভিডিওর দৈর্ঘ্য (ভাইরাল অংশ) | ১৫ সেকেন্ড |
এত বছর পর ভিডিওটি নতুন করে ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়ায় স্কট কেলি বিস্ময় ও সন্তোষ প্রকাশ করেন।
ভিডিওতে ব্রিটিশ নভোচারী টিম পিককে যেভাবে ভয় পেয়ে পালাতে দেখা গেছে, তা আসলে বাস্তব ছিল না। স্কট কেলি নিশ্চিত করেছেন যে, পুরো বিষয়টি আগে থেকেই সাজানো ছিল। ভিডিওটি যেন দেখতে আকর্ষণীয় ও মজাদার হয়, সেজন্য তাঁরা দুজনে মিলে আগে থেকেই এই পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন।
তবে টিম পিকের সঙ্গে করা ভিডিওটি সাজানো হলেও, মহাকাশ স্টেশনের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে স্কট কেলি সত্যিই বাস্তব রসিকতা করেছিলেন। মহাকাশযানে যে একটি গরিলার পোশাক লুকিয়ে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে অন্য ক্রু সদস্যদের কোনো ধারণাই ছিল না। স্কট কেলি সুযোগ বুঝে গরিলা সেজে এক ক্রু সদস্যের শোবার ঘরে লুকিয়ে থাকেন। তিনি বলেন:
“সে যখনই নিজের ঘরের দরজা খুলতে গেল, আমি ভেতর থেকে একঝটকায় হুড়মুড় করে বেরিয়ে এলাম। তার অবস্থা দেখে পরে আমার নিজেরই একটু ভয় লাগছিল। কারণ, ভয়ের চোটে তার আবার হার্ট অ্যাটাক বা ওই–জাতীয় বড় কোনো বিপদ যদি হয়ে যায়।”
এ ছাড়া স্কট কেলি গরিলার বেশে মহাকাশ স্টেশনের রুশ অংশেও হাজির হয়েছিলেন। শূন্য অভিকর্ষে ভেসে ভেসে তাঁকে রুশ নভোচারীদের এলাকায় চলে যেতে দেখে তাঁরা অত্যন্ত জোরে হেসে উঠেছিলেন।
২০১৬ সালে মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার পরপরই স্কট কেলি নাসার নভোচারী পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি জানান, মহাকাশে একটানা এক বছর কাটানোর একদম শেষ সময়ে মন ভালো রাখতে এবং মানসিক ক্লান্তি দূর করতে এই ধরনের কৌতুকের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল।
এই পাগলামির পেছনে কেবল বিনোদনই নয়, বরং একটি মহৎ উদ্দেশ্যও ছিল। স্কট কেলি সেই গরিলা স্যুটটি পরে শিশুদের জন্য একটি শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করেছিলেন। তাঁর মতে, ছোট বাচ্চাদের বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এই ধরনের ভিন্নধর্মী ও ভিজ্যুয়াল উদ্যোগ দারুণ কার্যকর ভূমিকা পালন করে।