খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বিদায় নিলেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। দীর্ঘ কয়েক দিন ধরে চলা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ সভা এবং সর্বশেষ ‘মব’ সংস্কৃতির ন্যাক্কারজনক বহিঃপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর অধ্যায়ের অবসান ঘটল। আজ বুধবার তাঁর নিয়োগ বাতিলের পাশাপাশি দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন পেশাদার ব্যবসায়ী ও হিসাববিদ মো. মোস্তাকুর রহমানকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
আজ সকাল থেকেই মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সংস্থাটির সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল’-এর ব্যানারে এক বিশাল প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আহসান এইচ মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে ‘স্বৈরশাসন’ কায়েম করেছেন। বিশেষ করে নীতিমালার বাইরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান এবং কর্মকর্তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনের মুখে গত কয়েক দিনে তিনজন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) প্রদান এবং তড়িঘড়ি করে ঢাকার বাইরে বদলি করার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে। কর্মকর্তাদের দাবি ছিল, আজকের মধ্যেই এসব আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে, অন্যথায় বৃহস্পতিবার থেকে ‘কলমবিরতি’ এবং পরবর্তীতে কঠোর কর্মসূচি পালন করা হবে।
কর্মকর্তাদের কঠোর প্রতিবাদের মুখেও আহসান এইচ মনসুর তাঁর পেশাগত অবস্থানে অনড় ছিলেন। দুপুরে এক তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। তিনি দাবি করেন, আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা এবং বিপর্যয়ের মুখে থাকা ব্যাংকগুলোকে উদ্ধারের জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলো অনেকের ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত হেনেছে।
আহসান এইচ মনসুর স্পষ্ট করে বলেন, “পদত্যাগ করতে আমার মাত্র দুই সেকেন্ড সময় লাগবে। আমি এখানে জাতির সেবা করতে এসেছি।” তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, একটি কুচক্রী মহল সাধারণ কর্মকর্তাদের ভুল বুঝিয়ে ব্যাংকগুলোকে পুনরায় পুরোনো ‘লুটেরা’ মালিকদের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে।
| সময়/পর্যায় | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী |
| সকাল ১০:০০ | অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের ব্যানারে প্রতিবাদ সভার শুরু। |
| দুপুর ০১:৩০ | আহসান এইচ মনসুরের সংবাদ সম্মেলন; কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি প্রদান। |
| বিকেল ০৩:০০ | আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিল ও মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের খবর। |
| বিকেল ০৪:৩০ | কর্মকর্তাদের তোপের মুখে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে লাঞ্ছিত করে বের করে দেওয়া। |
| সন্ধ্যা ০৬:০০ | কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরাপত্তা জোরদার ও পুলিশ মোতায়েন। |
নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে একদল কর্মকর্তা ‘মব’ তৈরি করে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে হেনস্তা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ‘ধর ধর’ স্লোগান দিয়ে তাঁকে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করা হয়। অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে কর্মকর্তাদের একটি দল তাঁকে ঘাড় ধরে গাড়িতে তুলতে বাধ্য করেন। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে এ ধরনের আচরণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এই আকস্মিক পরিবর্তনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, আহসান এইচ মনসুর একজন বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ এবং তাঁর সময়ে ব্যাংক খাতের সংস্কারে কিছু সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। হঠাৎ গভর্নর পরিবর্তন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পাঠাতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণের মতো স্পর্শকাতর প্রক্রিয়াগুলো এখন কোন দিকে যায়, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা নিরসন করা এবং ভেঙে পড়া ব্যাংক খাতের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। ব্যবসায়ী সমাজ থেকে আসা প্রথম গভর্নর হিসেবে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এখন গভীর পর্যবেক্ষণে থাকবে।