খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৫ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই লাতিন আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরে সরাসরি সামরিক অভিযানে নেমেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার (৪ মার্চ) মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড (সাউথকম) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, মাদক পাচার নির্মূল এবং দেশটিতে সক্রিয় ‘নির্ধারিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর’ বিরুদ্ধে তারা একটি বিশেষ যৌথ অভিযান শুরু করেছে। মূলত প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদক সম্রাটদের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতেই ওয়াশিংটন এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
মার্কিন সামরিক কমান্ডের ভাষ্যমতে, এই অভিযানটি ইকুয়েডরের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে পরিচালিত হচ্ছে। সাউথকম তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, “আমরা সেই নার্কো-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিচ্ছি, যারা দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর সন্ত্রাস, ব্যাপক সহিংসতা ও দুর্নীতির শাসন চাপিয়ে দিয়েছে।” এই অপারেশনের আওতায় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা হয়েছে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে ইকুয়েডর বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটগুলোর প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের দুই বৃহত্তম কোকেন উৎপাদনকারী দেশ—কলম্বিয়া ও পেরুর ঠিক মাঝখানে ইকুয়েডরের অবস্থান। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা দেশটিকে একটি নিরাপদ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।
নিচে ইকুয়েডরের বর্তমান মাদক পরিস্থিতি ও সহিংসতার চিত্র তুলে ধরা হলো:
| সূচক | বিবরণ/পরিসংখ্যান |
| অবস্থানগত গুরুত্ব | কলম্বিয়া ও পেরুর মধ্যবর্তী দেশ হওয়ায় প্রধান ট্রানজিট রুট। |
| পাচারের পরিমাণ | প্রায় ৭০% মাদক এই দেশের ভেতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। |
| প্রধান বন্দর | গায়াকিল এবং মান্তা (মাদক পাচারের প্রধান করিডোর)। |
| সহিংসতার হার | গত ৩ বছরে হত্যাকাণ্ডের হার ৩০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। |
| প্রধান প্রতিপক্ষ | আলবেনিয়ান মাফিয়া এবং মেক্সিকান কার্টেলের স্থানীয় সহযোগীরা। |
২০২৩ সালে ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইকুয়েডরের সাথে আমেরিকার নিরাপত্তা সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। গত বছর ইকুয়েডরের জনগণ এক গণভোটে দেশে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নিষিদ্ধ করার পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু বিশেষ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আইনি ফাঁক ব্যবহার করে আমেরিকা সেখানে তাদের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে মান্তা বন্দর নগরীর কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে মার্কিন ড্রোন এবং নজরদারি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে, যা দিয়ে মাদক পাচারকারীদের রুট শনাক্ত করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকার এই অভিযান কেবল মাদক নির্মূলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দক্ষিণ আমেরিকায় মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য পুনর্প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলগত অংশ। যদিও ওয়াশিংটন একে ‘নার্কো-সন্ত্রাসবাদের অভিশাপ’ মোকাবিলা হিসেবে দাবি করছে, তবুও এই অঞ্চলে সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপের ফলে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পাল্টা প্রতিশোধের প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে ইকুয়েডরের সাধারণ নাগরিকরা এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। একদিকে তারা মাদক কার্টেলের ভয়াবহ সহিংসতা থেকে মুক্তি চান, অন্যদিকে নিজ দেশের সার্বভৌমত্বে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তবে প্রেসিডেন্ট নোবোয়া সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে এই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। সামনের দিনগুলোতে এই যৌথ অভিযান লাতিন আমেরিকার মাদক রুটের মানচিত্র কতটা বদলে দিতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।