খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: 22শে আশ্বিন ১৪৩২ | ৭ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
গাজায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর চলমান সংঘাত যদি ক্রীড়ার স্কোরকার্ড হত, তা হয়তো এই প্রতিবেদনের শিরোনামের মতোই হত। ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, ‘দুর্ভেদ্য’ ইসরায়েলে ঢুকে পড়ে হামাসের একদল যোদ্ধা। ইসরায়েলের ভাষায়, এই ‘অসভ্য ও বর্বর’ বাহিনীর হাতে নিহত হন এক হাজার ২০০ মানুষ। এ থেকেই শুরু হয় গাজার ভয়াবহ সংঘাত।
প্রতিশোধের আবেগে আচ্ছন্ন ইসরায়েলি নেতৃত্ব তৎক্ষণাৎ হামাসকে নির্মূলের ঘোষণা দেয়। পরের দুই বছরে ইসরায়েলি সেনাদের নিরবচ্ছিন্ন ও নির্মম হামলায় ঝরেছে ৬৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণ। নিহতের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহতের সংখ্যা এক লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি, অনেকেই চিরতরে পঙ্গু। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর এ ধরনের হামলার নজির আধুনিক বিশ্বে বিরল বলে উল্লেখ করেছে।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে ইসরায়েল দাবি করে, ‘প্রতি তিন নিহত ফিলিস্তিনির মধ্যে দুই জনই হামাস সদস্য’। তবে এ দাবি বাস্তবসম্মত প্রমাণে সমর্থিত হয়নি। দুই দফায় অল্প কিছুদিনের বিরতির পরও টেকসই যুদ্ধবিরতি বা শান্তি প্রতিষ্ঠার যেকোনো উদ্যোগ দুই পক্ষের অনমনীয় অবস্থানের কারণে ব্যর্থ হয়েছে।
সংঘাতের সূচনা
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, হামাস ও সমমনা কয়েকটি সংগঠন ‘আল-আকসার বন্যা’ অভিযানের অংশ হিসেবে ইসরায়েলে ঢুকে পড়ে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে তারা কিব্বুৎজ গ্রাম ও নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যালে হামলা চালায়। ইসরায়েলের আধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে পরাস্ত করে এক হাজার ২০০ জন নিহত হয়, যার মধ্যে ৮১৫ জন বেসামরিক এবং ৩৬ শিশু। ২৫১ জন জিম্মিও হন।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দ্রুত তিন লাখ রিজার্ভ সেনা যোগাড় করে গাজায় বিমান হামলা শুরু করেন। গাজা পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়, বিদ্যুৎ, পানি ও জ্বালানি সরবরাহ কমে আসে। প্রথম ২০ দিনে অন্তত সাত হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হন।
বৃহৎ হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ
১৭ অক্টোবর আল-আহলি আরব হাসপাতালে বিস্ফোরণে ৪৭১ জন নিহত হন। ইসরায়েল দায় অস্বীকার করে, দাবি করে ফিলিস্তিনের ইসলামিক জিহাদের ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে হাসপাতালে আঘাত করেছে।
২৭ অক্টোবর থেকে গাজায় স্থল অভিযান শুরু করে আইডিএফ। এক লাখ সেনা উত্তরে ঢুকে হামাসের অবকাঠামো লক্ষ্য করে। ৩১ অক্টোবর জাবালিয়া আশ্রয় শিবিরে বিমান হামলায় ৬৮ শিশুসহ ১২৬ জন নিহত হন। ইসরায়েল দাবি করে, হামাস কমান্ডার ইব্রাহিম বিয়ারি সেখানে ছিলেন; তবে হামাস তা প্রত্যাখ্যান করে।
নভেম্বরের ১৫–২৪ তারিখে আইডিএফ আল-শিফা হাসপাতালে অভিযান চালায়। হাসপাতালকে হামাসের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র দাবি করা হলেও দুই সপ্তাহের অভিযান শেষে এ দাবির যথাযথ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধবিরতি ও মানবিক বিপর্যয়
২৪ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর কাতারের মধ্যস্থতায় প্রথম সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়। বন্দি বিনিময় হয়: হামাসের হাতে থাকা ১০৫ জিম্মি মুক্তি পায়, বিপরীতে ইসরায়েলের কারাগারে আটক ২৪০ ফিলিস্তিনি ছাড়া হয়। তবে দু’পক্ষের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে চুক্তি দ্রুত ভেঙে যায়।
২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি এককভাবে সবচেয়ে বেশি ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়। ২৯ ফেব্রুয়ারি গাজার ময়দায় ত্রাণ নিতে আসা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলায় ১১২ জন নিহত হয়। এপ্রিল মাসে দাতব্য প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাত কর্মী নিহত হন। মে মাসে রাফা সীমান্তে স্থল অভিযান শুরু করে ইসরায়েল; ছয় লাখ ফিলিস্তিনি বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
জুনে নুসেইরাত শিবিরে জিম্মি উদ্ধার অভিযানে চার জিম্মি উদ্ধার হয়, তবে কমপক্ষে ২৭৪ ফিলিস্তিনি নিহত হন। ২০২৪ সালের আগস্ট–ডিসেম্বর পর্যন্ত গাজার ৩৬ হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৭টি আংশিকভাবে চালু ছিল, এক হাজারেরও বেশি চিকিৎসাকর্মী নিহত হন।
দ্বিতীয় যুদ্ধবিরতি ও নতুন হামলা
২০২৫ সালের জানুয়ারি, কাতারের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় যুদ্ধবিরতি হয়। হামাস ৩০ জিম্মি ও তাদের আট মরদেহ হস্তান্তর করে, বিপরীতে প্রায় এক হাজার ৯০০ ফিলিস্তিনি বন্দি মুক্তি পান। তবে চুক্তি পূর্ণ হয়নি। ১৮ মার্চ থেকে ইসরায়েল পুনরায় হামলা শুরু করে। রমজান মাসে ৪০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন, অনেক জ্যেষ্ঠ হামাস নেতা প্রাণ হারান।
গাজার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, নেতজারিম করিডর দখল, জাতিসংঘ ভবনে হামলায় সাত ত্রাণকর্মী নিহত। ১৯২ সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন, আল-জাজিরার ছয় সাংবাদিকও নিহত।
মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা
গাজার একতরফা অবরোধ উপেক্ষা করে স্পেন, ইতালি, তিউনিশিয়া থেকে নৌকা পাঠানো হয়। গ্রেটা থুনবার্গসহ ৫০০ রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকারকর্মী অংশগ্রহণ করেন। তবে ইসরায়েলি নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌকাগুলো আটক করে।
২৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। নেতানিয়াহু এবং হামাস এতে সম্মত হন। অক্টোবর থেকে হামলার মাত্রা কিছুটা কমে।
সবার প্রত্যাশা, এই আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে।