খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 28শে চৈত্র ১৪৩২ | ১১ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মধ্যপ্রাচ্যে টানা ঊনচল্লিশ দিনের হামলা-পাল্টা হামলার পর পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই সংঘাতের ধারাবাহিকতায় বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় ইরান, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এই যুদ্ধবিরতির পর স্থায়ী শান্তি ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উদ্দেশ্যে শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকের আগে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ঘিরে শেষ মুহূর্তে কিছু জটিলতা তৈরি হলেও, ইরান শর্তসাপেক্ষে আলোচনায় অংশ নিতে সম্মত হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়। ধারণা করা হচ্ছে, বৈঠকের আগে একটি সমঝোতামূলক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে জানান, শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদে সংলাপে অংশ নেবেন। তিনি এই উদ্যোগকে শান্তির পথে এগোনোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি এখন “সংকটপূর্ণ পর্যায়ে” পৌঁছেছে এবং এটি “সফলতা বা ব্যর্থতা—যে কোনো একদিকে মোড় নিতে পারে”।
ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তাঁরা শনিবার ভোরে ইসলামাবাদে পৌঁছান। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তাঁদের স্বাগত জানান উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিক, প্রতিরক্ষা প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নকভি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলও ইসলামাবাদে পৌঁছায়। দলে নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার।
| পক্ষ | প্রতিনিধি | পদবি |
|---|---|---|
| ইরান | বাঘের গালিবাফ | পার্লামেন্ট স্পিকার |
| ইরান | আব্বাস আরাগচি | পররাষ্ট্রমন্ত্রী |
| যুক্তরাষ্ট্র | জে.ডি. ভ্যান্স | ভাইস প্রেসিডেন্ট |
| যুক্তরাষ্ট্র | স্টিভ উইটকফ | বিশেষ দূত |
| যুক্তরাষ্ট্র | জ্যারেড কুশনার | উপদেষ্টা |
ইসহাক দার আশা প্রকাশ করেন যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেবে এবং পাকিস্তান একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান খুঁজে পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, উনিশশো উনসত্তরের পর এই প্রথমবারের মতো ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হতে যাচ্ছে। তবে আলোচনার আগে ইরান কিছু শর্ত আরোপ করে, যার মধ্যে রয়েছে লেবাননে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং বিদেশে জব্দ থাকা প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়া।
ইরানি স্পিকার বাঘের গালিবাফ আরও জানান, এই দুটি শর্ত পূরণ না হলে আলোচনায় অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। দিনভর ইসলামাবাদ, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকে, যেখানে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোও যুক্ত ছিল।
এর আগে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনেই লেবাননে ব্যাপক হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ইরান মনে করে, যুদ্ধবিরতি সব ফ্রন্টে কার্যকর হওয়া উচিত, যেখানে সংশ্লিষ্ট সব গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান ছিল ভিন্ন, তারা লেবাননের ঘটনাকে পৃথক পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা আলোচনায় আন্তরিকভাবে অংশ নিতে প্রস্তুত, তবে সময়ক্ষেপণ বা কৌশলগত বিলম্ব তারা গ্রহণ করবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা আবারও তৈরি হতে পারে।
আলোচনার প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌচলাচল ব্যবস্থাপনা এবং জব্দকৃত সম্পদ ফেরত দেওয়া। দুই পক্ষের মধ্যে আঞ্চলিক প্রভাব, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং নীতিগত ছাড়ের ক্রম নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য বিদ্যমান।