খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলে পুনরায় একটি বাণিজ্যিক ট্যাংকার জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আজ শনিবার (১৩ জুন) যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ‘ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ (ইউকেএমটিও) আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, গতকাল শুক্রবার ওমান উপসাগরের জলসীমায় একটি অজ্ঞাত বস্তু ওই বাণিজ্যিক ট্যাংকার জাহাজটিকে লক্ষ্য করে আঘাত হানে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংবেদনশীল নৌপথে সাম্প্রতিক সময়ে বাড়তে থাকা চরম সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে এই নতুন হামলার ঘটনাটি ঘটল।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ইউকেএমটিও তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, ওমানের মূল উপকূলীয় ভূখণ্ড থেকে আনুমানিক ৬ নটিক্যাল মাইল পূর্ব দিকে অবস্থানকালে ট্যাংকার জাহাজটি এই অজ্ঞাত হামলার শিকার হয়। তবে অত্যন্ত স্বস্তির বিষয় এই যে, আকস্মিক এই হামলার পরও জাহাজে থাকা সব ক্রু ও নাবিক সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সুস্থ আছেন। হামলার প্রভাবে সাগরের পানিতে তেল বা রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার মতো কোনো পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও ঘটেনি। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ওঠার পর বাণিজ্যিক ট্যাংকার জাহাজটি পুনরায় তার নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেও ওমান উপকূলে চলাচলকারী দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র (মিসাইল) হামলা চালিয়েছিল। অত্যন্ত ভয়াবহ ওই মার্কিন হামলায় জাহাজে কর্মরত তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হন। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবং আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র আলোচনার মাঝেই ওমান উপকূলে আবারও এই নতুন ট্যাংকার জাহাজে হামলার ঘটনাটি সংঘটিত হলো, যা এই অঞ্চলের সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলায় নিজেদের তিনজন নিরীহ নাগরিক ও নাবিক নিহত হওয়ার পর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ও তীব্র কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। নয়াদিল্লি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে পর পর দুইবার ভারতে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বা দূতকে তলব করে নিজেদের কঠোর অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছে। তবে এই তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাথে যোগাযোগ করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি ও ইরানি বন্দরে মার্কিন প্রশাসন যে কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ আরোপ করেছে, তা বিশ্বের সব রাষ্ট্রকে বাধ্যতামূলকভাবে মেনে চলতে হবে।
হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলকারী সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সকল বিধিনিষেধ ও নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কো রুবিও। তিনি ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধের যেকোনো ধরনের লঙ্ঘন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া বা সহ্য করা হবে না। জয়শঙ্করের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও আরও স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, “হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অবরোধের লঙ্ঘন এবং ইরানের তেলের অবৈধ পরিবহন কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।”
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সফরে ইউরোপে অবস্থান করছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এই জরুরি ফোনালাপে তিনি ওমান উপসাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনজন ভারতীয় নাবিকের নিহতের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করেন। তিনি এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানির বিষয়ে ভারতের গভীর উদ্বেগের কথা মার্কিন প্রশাসনকে সরাসরি অবহিত করেন।
চলতি সপ্তাহে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই বিশ্ব তেল পরিবহন পথকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা চরম আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝেই ওমানের কাছাকাছি হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনী ওই মারাত্মক হামলাটি চালিয়েছিল, যার ফলে জাহাজে থাকা তিনজন ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারান। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ঘিরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই দ্বিমুখী সংঘাত এবং একের পর এক জাহাজে হামলার ঘটনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।