খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
দেশের বীমা খাতের অভিভাবক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সম্প্রতি ‘আইডিআরএ ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। তবে এই পুরস্কারের তালিকায় এমন একটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে, যার গত তিন বছরের আর্থিক কর্মকাণ্ড ও পারফরম্যান্স চরম হতাশাজনক। প্রতিষ্ঠানটি হলো ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। প্রিমিয়াম আয়, বিনিয়োগ, মুনাফা ও রিজার্ভ—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে কোম্পানিটির অবস্থান নিম্নমুখী হওয়া সত্ত্বেও আইডিআরএ-র পক্ষ থেকে একে ‘অসাধারণ পারফরম্যান্স’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই বৈপরীত্য বীমা খাতের স্বচ্ছতা ও আস্থার ওপর বড় ধরণের প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।
ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির প্রতিটি আর্থিক সূচকে অবনতি ঘটেছে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটির মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ১১৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা ২০২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯৪ কোটি ৭ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটি প্রায় ২০.৭০ শতাংশ প্রিমিয়াম আয় হারিয়েছে।
ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক অবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ:
| সূচকের নাম | ২০২২ সালের চিত্র | ২০২৪ সালের চিত্র | পরিবর্তনের হার/পরিমাণ |
| মোট প্রিমিয়াম আয় | ১১৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা | ৯৪ কোটি ৭ লাখ টাকা | ২০.৭০% হ্রাস |
| নিট মুনাফা (কর পরবর্তী) | ১৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা | ৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা | ৩৪.৫৮% হ্রাস |
| মোট বিনিয়োগ | ৮৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা | ৭৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা | ১৪.৯৪% হ্রাস |
| রিজার্ভ ফান্ড | ১১৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা | ১০৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা | ৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা হ্রাস |
| বীমা দাবি পরিশোধ | ৩৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা | ১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা | ৫০.৪২% হ্রাস |
| শেয়ার প্রতি আয় (EPS) | ১.৬৩ টাকা | ১.০৭ টাকা | ৩৪.৩৫% হ্রাস |
| শেয়ারের বাজারমূল্য | ২৪.৪০ টাকা | ১৯.৫০ টাকা | ২০.০৮% হ্রাস |
বীমা কোম্পানির সক্ষমতার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো বীমা দাবি পরিশোধের হার। ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে এই চিত্রটি আরও ভয়াবহ। ২০২২ সালে কোম্পানিটি যেখানে ৩৭ কোটি ৯০ লাখ টাকার দাবি মিটিয়েছিল, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকায়। দাবি পরিশোধের এই উল্লেখযোগ্য হ্রাস বীমা গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। পুঁজিবাজারেও কোম্পানিটির শেয়ারের বাজারমূল্য এবং নিট সম্পদ মূল্য (NAV) ধারাবাহিকভাবে কমছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বীমা খাতে শৃঙ্খলা ও ইতিবাচক ইমেজ তৈরির লক্ষ্যে আইডিআরএ লাইফ ও নন-লাইফ খাতের মোট ১৩টি কোম্পানিকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে। ১৮ জানুয়ারি সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মনিরা বেগম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়।
নন-লাইফ বীমা খাতে পুরস্কারপ্রাপ্ত শীর্ষ কোম্পানিগুলো:
১. প্রগতি ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড (প্রথম)
২. সাধারণ বীমা করপোরেশন (দ্বিতীয়)
৩. রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স পিএলসি (তৃতীয়)
৪. গ্রীণ ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি (চতুর্থ)
৫. ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স, সেনা ইন্স্যুরেন্স ও ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স (যৌথভাবে পঞ্চম)
অন্যদিকে লাইফ বীমা খাতে মেটলাইফ প্রথম এবং প্রগতি লাইফ দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রগতি বা রিলায়েন্সের মতো ভালো পারফর্ম করা কোম্পানির কাতারে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের মতো দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানি কীভাবে স্থান পেল?
পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে আইডিআরএ-র মানদণ্ড নিয়ে ব্যাপক অস্পষ্টতা লক্ষ্য করা গেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ‘সার্বিক সুশাসন ও অসাধারণ পারফরম্যান্স’-এর কথা বলা হলেও দুর্বল আর্থিক সূচকগুলো এর উল্টো প্রমাণ দিচ্ছে। এ বিষয়ে আইডিআরএ-র মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এমনকি ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সেলিমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।
দেশের বীমা খাত যখন গ্রাহক আস্থার সংকটে ভুগছে, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত খাতের স্বচ্ছতাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আর্থিক সূচকে ক্রমাগত অবনমন ঘটা একটি প্রতিষ্ঠানকে ‘এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান আদতে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মূল্যায়নকে ম্লান করে দিচ্ছে। সাধারণ গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে আইডিআরএ রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতাকে প্রাধান্য দেবে।