খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে কার্তিক ১৪৩২ | ২৯ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
স্বেচ্ছাসেবামূলক সেবার অন্যতম প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিআরসিএস)। বড় দুর্যোগ-দুরিত্তে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এ সংস্থাটির নাম সারা দেশে পরিচিত। অথচ গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে সংস্থাটির ভিতরে চলছে বিস্তৃত অস্থিরতা — একের পর এক অনিয়ম, আচরণগত ও নিয়োগগত কোন্দল এবং ‘দলীয়ীকরণ’–এর অভিযোগ। কর্মকর্তা, কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবকদের অভিযোগে বলা হচ্ছে, বর্তমান চেয়ারম্যানের অধীনে সংস্থাটি শৃঙ্খলাবিহীন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শিথিল হয়েছে।
শুরু কোথা থেকে — অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত নতুন পরিচালনা পর্ষদ থেকেই সংকট শুরু বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে — পিএস নিয়োগে অনিয়ম, অবসরপ্রাপ্ত দুই পরিচালককে চুক্তিভিত্তিক পুনর্নিয়োগ, নারী নিপীড়নের শাস্তি প্রত্যাহারের মাধ্যমে পদোন্নতি, দুর্নীতিতে দণ্ডপ্রাপ্তদের তোষণ, এবং ‘কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট’ পদে বিধিভঙ্গ করে অনিয়মসহ নানা অনিয়ম।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিকারের চেষ্টা হলে চেয়ারম্যান ও তার সমর্থকরা তাদের দমন করেছেন; কেউ কেউ প্রশাসনিক ও শারীরিক হেনস্তার শিকার হয়েছেন। ধীরে ধীরে কর্মীরা ও স্বেচ্ছাসেবকরা গত ৮ অক্টোবর থেকে টানা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলনে নেমে পড়ে। আন্দোলনকারীদের ওপর কড়া ব্যবস্থা প্রয়োগের পরও সংগঠনের ভেতরে চাপা ক্ষোভ রয়ে গিয়েছে, বলছেন আন্দোলনকারীরা।
চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি-এনসিপির একাধিক ব্যক্তির যোগসাজশে একটি গ্রুপ আমার বিরুদ্ধে মব করছে।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রেড ক্রিসেন্ট তাদের নিজস্ব আইন ও বিধি অনুসরণ করে; সরাসরি হস্তক্ষেপ করার পক্ষপাতী নয়। তবে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদ গঠন ও তাদের মেয়াদবৃদ্ধি—উভয়ই মন্ত্রণালয়ের আদেশে হয়েছে। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম জানান, তিনি ব্যবস্থা নিতে বলেছেন এবং পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের জন্য চেয়ারম্যানকে তিন মাস সময় দিয়েছেন; শুধু নির্বাচন করে তিনি চলে যাবেন।
নিয়োগ ও পদায়নে অভিযোগ: নিয়োগবিধি ভঙ্গ ও স্বজনপ্রীতি
রেড ক্রিসেন্টের যোগাযোগ বিভাগে ‘কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট’ পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে নিয়োগবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগ অনুসারে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক আরিফা মেহরা সিনহা একজন ক্যান্ডিডেটের (মো. মিদুল ইসলাম মৃদুল) অতিরিক্ত আবেদন নিজে জমা দিয়েছেন এবং তাকে শর্টলিস্টে রেখেছেন — অথচ ওই প্রার্থীর কর্মজীবন সংক্রান্ত তথ্য তৈরিও রয়েছে বলে অভিযুক্তরা দাবি করেছেন। কর্মীদের দাবি, যথাযথ বাছাই-প্রক্রিয়া ও পরীক্ষা ছাড়াই কিছু পদের জন্য অনিয়মে নিয়োগ করা হয়েছে।
চেয়ারম্যানের পিএস ও কিছু ভাইভিন্ন নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ উচ্চারণ করা হয়েছে — পিএস-১ সোহাগ মিয়ার ক্ষেত্রে বেতনের ধারাবাহিক পরিবর্তন, নিয়োগ বিধির পরিপন্থী বেতন ও সুবিধা প্রদানের ব্যাপারটি নিয়োগবিধি লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোজিত তথ্য অনুযায়ী, সোহাগ মিয়া পূর্বে একটি মেডিকেল কোম্পানির মেডিকেল প্রতিনিধি ছিলেন এবং চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। (নোট: সোহাগ পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চাপে পদত্যাগ করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।)
বদলি, পদায়ন ও ‘দলীয়ীকরণ’—পুরোনো কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করা হচ্ছে
প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র কর্মকর্তাদের অনুপযুক্তভাবে বদলি ও ‘কম সন্মানজনক’ দায়িত্বে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রবীণ কর্মকর্তা জাফর ইমাম সিকদারকে চট্টগ্রামে বদলি করে উপ-পরিচালক পর্যায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়; এছাড়া একাধিক ক্ষেত্রে এমন বদলির ঘটনা উঠে এসেছে যেখানে পেশাগত উপযোগিতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে বদলি মেলেনি বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।
অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতাকর্মীসহ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে, তাদেরকে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে — ফলে প্রতিষ্ঠান ‘আওয়ামীকরণ’ করা হচ্ছে। রেড ক্রিসেন্টের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ডা. মাহমুদা আলম মিতু জানিয়েছেন, মহাসচিবের তিনদিনের ছুটির সময় সংশ্লিষ্ট চক্র দ্রুত কয়েকটি বদলি ও পুনর্বহাল করে নিয়েছে এবং এতে বোর্ডে পূর্বনির্ধারিত বদলিগুলো অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
নারী নিপীড়ন মামলার রিভিউ ও শাস্তি প্রত্যাহার
২০২৩ সালে নারী নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত উপ-সহকারী পরিচালক মইন উদ্দিন (মঈন)কে তখনকার শাস্তি থেকে রিহ্যাবে করে বর্তমান কর্তৃপক্ষ পুনর্বহাল করেন—বহির্ভূত কেউ বলছেন, প্রমাণিত থাকার পরও রিভিউ করে শাস্তি বাতিল করা হয়েছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে নিয়োগ পান। অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান ভিন্নমত ব্যক্ত করেন; অভিযুক্ত নারী কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ এবং বলছেন, ‘তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর দণ্ড দেওয়া হয়েছিল; এক বছর পর রিভিউ করে বাতিল করা হয়েছে—এটা নিয়মতান্ত্রিক নয়।’
চেয়ারম্যান বলেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তা ‘ভদ্র ও দক্ষ’ এবং অভিযোগকারীর পোশাক/আচরণ দেখে তিনি বিব্রত বোধ করেছিলেন — এমন যুক্তি দিয়েছেন তিনি। (এই বক্তব্য প্রতিবেদন থেকে নথিভিত্তিকভাবে নেওয়া।) অভিযোগকারী নারী ও সমর্থকরা এই রিভিউ প্রক্রিয়াকে অনৈতিক এবং বিধিগত দিক থেকে অসংগত বলে উত্থাপন করেছেন।
তদন্ত-প্রক্রিয়া ও দুদকের হস্তক্ষেপ
সংস্থার ভেতরের বিতর্ক ও অনিয়ম নিয়ে বোর্ডের অন্তত কয়েকজন সদস্য নিজ উদ্যোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)কে জানায়; অনেকে বলছেন ‘নিজেরা দুদক ডেকে প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করেছেন’—এরকম কথাও উঠে এসেছে। সংস্থার কর্মকর্তারা স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা দাবি করেছেন।
চেয়ারম্যান জানান, ‘আমি আসার পর নানান প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করছি… নানা অভিযোগও পেয়েছি; সমাধানেরও চেষ্টা করছি।’ স্বাস্থ্য বিভাগ ও মহাপরিচালনার উচ্চ পর্যায় থেকে পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের নির্দেশ ও সময়সীমা দেয়া হলেও, বাস্তবে নির্বাচন আয়োজন বা প্রকৃত স্বচ্ছতা আনতে বৈশিষ্ট্যগত অগ্রগতি দেখা যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ ও প্রতিউত্তরের টুকিটাকি
অভিযোগকারী কর্মকর্তা-স্বেচ্ছাসেবকরা বলছেন, ‘যিনি আমার মতের বিরুদ্ধে যান, তার ওপর নেমে আসে চেয়ারম্যানের খড়্গ’—অর্থাৎ স্বৈরাচারী আচরণ চলছে।
কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘ভিকটিমদের মানসিক বিকারগ্রস্ত প্রমাণ করার’ চেষ্টা করা হচ্ছে, এমন অভিযোগও উঠেছে; ভারপ্রাপ্ত নির্দেশে ভিকটিমদের মনোচিকিৎসকের কাছে কাউন্সেলিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে বলা হয়।
রেড ক্রিসেন্টের জনপ্রতিনিধি ও পরিচালনা পর্ষদের কিছু সদস্য দাবি করিছেন যে আন্দোলনকারীরা দুর্নীতিগ্রস্ত নয়; তারা প্রতিষ্ঠানের পুরোনো দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আওয়াজ তুলেছিল।
কোথায় পৌঁছালো—গত কর্মসম্পাদনা ও বর্তমান বাস্তবতা
রিপোর্ট সূত্রে উঠে এসেছে—চেয়ারম্যানের সময়ে স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সেবা কার্যক্রম নেই; অনেক কর্মকর্তা দাবি করেন, গত দেড় বছরে সেবায় সাফল্য কম এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সংস্থার সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা চান স্বচ্ছ নির্বাচন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা হোক, যাতে রেড ক্রিসেন্ট পুনরায় তার মানবিক কাজ দক্ষভাবে চালিয়ে যেতে পারে।