খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 26শে মাঘ ১৪৩২ | ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে নবজাতক শিশু হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত নার্স লুসি লেটবির (Lucy Letby) মামলাটি এক সময় সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। ২০২৩ সালের আদালতের রায় এবং ২০২৬ সালে নেটফ্লিক্সে প্রকাশিত তথ্যচিত্র ‘দ্য ইনভেস্টিগেশন অব লুসি লেটবি’ আবারও প্রশ্ন তুলেছে—তিনি কি সত্যিই দোষী, নাকি চিকিৎসা ব্যবস্থার ত্রুটি ও তদন্তের দুর্বলতার শিকার?
লুসি লেটবি ১৯৯০ সালের ৪ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিশু নার্সিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি চেস্টার কাউন্টিস হাসপাতালের নবজাতক ইউনিটে কর্মজীবন শুরু করেন। সহকর্মীদের মতে, শুরুতে তাঁর আচরণ বা পেশাগত দক্ষতায় কোনো অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়নি।
২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে একের পর এক নবজাতক মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে শুরু করে। জুন মাসেই কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের প্রশাসন উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং তদন্ত শুরু করে। তদন্তে দেখা যায়, প্রায় সব মৃত্যুর সময় লুসি ডিউটিতে ছিলেন। তাকে রাতের শিফট থেকে সরিয়ে দিনের শিফটে দেওয়া হলেও শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়া বন্ধ হয়নি।
নিম্নের টেবিলটি মৃত্যুর সময় ও শিফটের সম্পর্ক তুলে ধরে:
| বছর | শিশু মৃত্যুর সংখ্যা | লুসি উপস্থিতি | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| ২০১৫ | 7 | সবসময় | উদ্বেগ সৃষ্টি |
| ২০১৬ | 12 | 10 বার | তদন্ত শুরু |
| ২০১৭ | 15 | 13 বার | দিনের শিফটেও মৃত্যু |
| ২০১৮ | 8 | 7 বার | গ্রেপ্তার পূর্ব পর্যন্ত |
২০১৮ সালে লুসি গ্রেপ্তার হন। তার বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় ব্যক্তিগত নথিপত্র, যেখানে নবজাতকদের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য ছিল। তিনি দাবি করেন, নথিপত্র ভুলবশত বাড়িতে এনেছেন।
২০২২ সালে বিচার শুরু হয়। প্রসিকিউশন অভিযোগ করেন, তিনি শিশুদের শরীরে বাতাস প্রবেশ করানো, অতিরিক্ত খাবার দিয়ে শ্বাসনালিতে সমস্যা সৃষ্টি করা, এবং ইনসুলিন প্রয়োগের মতো কার্যকলাপে নিযুক্ত ছিলেন। ২০২৩ সালের আগস্টে আদালত তাকে সাত শিশুর হত্যার ও আরও সাত শিশুর হত্যাচেষ্টার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্রে লুসির আইনজীবী মার্ক ম্যাকডোনাল্ড উল্লেখ করেছেন—কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই, কোনো ভিডিও ফুটেজ নেই, কেউ সরাসরি দেখেনি। পোস্ট-ইট নোটে লেখা ‘আমি তাদের মেরেছি’ এবং অন্যান্য শব্দগুলো মানসিক চাপের প্রতিফলন, সরাসরি স্বীকারোক্তি নয়।
লুসি অভিজ্ঞ নার্স ছিলেন, তাই গুরুতর অসুস্থ শিশুদের দায়িত্ব তার ওপর বেশি পড়ত। তাকে সরানোর পর নবজাতক ইউনিটে গুরুতর রোগী ভর্তি কমে যায়, ফলে মৃত্যুহার কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর উপসর্গগুলো ইচ্ছাকৃত হত্যা নয়, বরং চিকিৎসা সমস্যা ও অক্সিজেন ঘাটতির ফল।
কিছু সংসদ সদস্য এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এই মামলার পুনর্বিচারের দাবি তুলেছেন। তারা বলছেন, এটি বিচারব্যবস্থার বড় ধরনের ভুল হতে পারে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং তদন্ত সংস্থার কিছু অংশ এখনও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, লুসি দায়ী।
লুসি লেটবি কি সত্যিই যুক্তরাজ্যের এক ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার, নাকি এক বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল ব্যবস্থা ও তদন্তের ফল—এ প্রশ্নের উত্তর এখনও অস্পষ্ট। তথ্যচিত্রটি আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, আদালতের রায় সবসময় চূড়ান্ত সত্য প্রকাশ করে না। এখন নজর কেন্দ্রীভূত—এই মামলার পুনর্বিচার হবে কি না এবং সেখানে কি বাস্তবতার চূড়ান্ত রূপ উন্মোচিত হবে।