খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে কজন মানুষ তাঁদের প্রজ্ঞা, ত্যাগ, দেশপ্রেম এবং মানবিকতার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের অন্যতম দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। তিনি ছিলেন একাধারে ব্যারিস্টার, রাজনীতিবিদ, স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজসংস্কারক, কবি, লেখক এবং জননেতা। তাঁর সমগ্র জীবন ছিল দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এক অনন্য সাধনা।
আইনজীবী হিসেবে তাঁর খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য। ১৯০৮ সালের ঐতিহাসিক আলিপুর বোমা মামলায় তিনি বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ-এর পক্ষে দাঁড়িয়ে অসাধারণ যুক্তি ও আইনি প্রজ্ঞার মাধ্যমে তাঁকে বেকসুর খালাস করিয়ে আনেন। এই মামলা তাঁকে ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যারিস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
রাজনীতিতেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। অসহযোগ আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯২২ সালে গয়া কংগ্রেস অধিবেশনে মতপার্থক্যের কারণে সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে স্বরাজ পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য থেকেই সংগ্রামকে আরও কার্যকর করা।
স্বদেশি চেতনার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ছিল অকৃত্রিম। অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর তিনি বিদেশি পোশাক বর্জন করেন এবং সারাজীবন খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি পরিধান করেন। ব্যক্তিগত বিলাসিতা ত্যাগ করে তিনি দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর বিপুল উপার্জনের একটি বড় অংশ তিনি জাতীয় আন্দোলন, শিক্ষা ও জনকল্যাণে ব্যয় করেন।
১৯২৪ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি আধুনিক নগর প্রশাসনের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কলকাতার নাগরিক সেবা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও পৌর পরিচালনায় তিনি নতুন দিগন্তের সূচনা করেন।
সাহিত্যপ্রেমী চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন একজন কবি ও লেখকও। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত সাহিত্যপত্র নারায়ণ সমকালীন সাহিত্য ও চিন্তাচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন মত ও চিন্তার অবাধ প্রকাশের কারণে পত্রিকাটি তৎকালীন সাহিত্যাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭০ সালের ৫ নভেম্বর, ঐতিহাসিক বিক্রমপুরের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার তেলিরবাগ গ্রামে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজসেবায় অগ্রগণ্য।
মাত্র ৫৫ বছর বয়সে, ১৯২৫ সালের ১৬ জুন দার্জিলিংয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র ভারতবর্ষ শোকাহত হয়েছিল। তাঁকে হারিয়ে জাতি হারিয়েছিল একজন দূরদর্শী নেতা, মানবতাবাদী চিন্তক এবং স্বাধীনতার এক নিবেদিত সৈনিককে।
দেশবন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—
“এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ,
মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”
এই দুটি পঙ্ক্তিই যেন তাঁর সমগ্র জীবনের শ্রেষ্ঠ পরিচয়। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ, দেশপ্রেম, ত্যাগ এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও বাঙালির ইতিহাসে ও চেতনায় অমর হয়ে আছে।
দেশবন্ধুর ১০১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।