খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫
নকল ট্রেড লাইসেন্স, ভুয়া ব্যাংক সলভেন্সি, জাল আইডি—সবকিছু যেন মুহূর্তেই ‘বৈধ’ হয়ে যায় ইমিগ্রেশন কাউন্টারে। বোর্ডিং পাসে কলমের খোঁচায় লেখা থাকে রহস্যময় কোড—এসএল, এসএস-ওকে, অপস স্যার। সঙ্গে থাকে স্বাক্ষর। আর ঠিক এই চিহ্নগুলোকেই পাসপোর্ট-ভিসার ওপরে বৈধতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষকে মালয়েশিয়ায় চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে দেওয়া হয় স্থায়ী আয়ের আশ্বাস। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে থাকে প্রতারণা আর অনিশ্চয়তার অন্ধকার।
গণমাধ্যমের দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এসপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই চক্র দেশের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করেছে। প্রতিদিন শতাধিক যাত্রীর বোর্ডিং পাসে একই কলমের দাগ, একই কোড ও একই স্বাক্ষর পাওয়া যায়। আর এই অনানুষ্ঠানিক ‘অনুমোদন’ দেখিয়েই বিদেশে পাঠানো হয় বৈধতার ছিটেফোঁটা না থাকা মানুষদের। অনেকেই মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশনে আটকা পড়ে ফেরত আসেন, কেউ লুকিয়ে কাজ করেও বেতন পান না, কেউ আবার সব হারিয়ে দেশে ফিরে আসেন।
মালয়েশিয়া পাঠানোর এই ‘ব্যবসা’ এখন ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকার প্যাকেজে পরিণত হয়েছে। বিনিময়ে বিমানবন্দরের কাউন্টার পেরিয়ে অনেকে অজানার পথে যাত্রা করেন, যেখানে অপেক্ষায় থাকে প্রতারণা আর কষ্টগাথা।
জানা গেছে, চক্রটি প্রথমে গ্রামাঞ্চলের সরল মানুষদের টার্গেট করে। এরপর তাদের বিদেশে ভালো বেতন ও উন্নত জীবনের লোভ দেখানো হয়। নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় পরিবার-পরিজনের জমানো অর্থ তুলে দেন তারা। এরপর চক্রটি তাদের নামে তৈরি করে নকল ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক সার্টিফিকেট, ব্যাংক সলভেন্সি, অফিস আইডি কার্ড ও ভিজিটিং কার্ড। এসব জাল কাগজ ব্যবহার করে জোগাড় করা হয় ভিজিট ভিসা। পরে তাদের ‘ব্যবসায়ী’ সাজিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়।
চক্রের সদস্যরা ইমিগ্রেশন শাখায় সিনিয়র পদে থাকায় তাদের জন্য এসব কাজ করা খুবই সহজ। কিন্তু যাত্রীরা বেশিরভাগই মালয়েশিয়ায় গিয়ে বিপাকে পড়েন। কেউ লুকিয়ে কাজ করেন, কেউ বেতন পান না, কেউ অভিযানে আটক হয়ে ফেরত আসেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রের প্রধান ব্যক্তি পুলিশের বিশেষ শাখার এসপি সম্রাট মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। মাঠপর্যায়ে দালাল চক্র ও কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সি তাদের হয়ে কাজ করে। সব সমন্বয় করেন এয়ার ক্লাউড ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফারুক শেখ। তিনিই নকল কাগজপত্র তৈরি, টিকিট কাটা—সবই দেখেন।
বিভিন্ন বোর্ডিং পাসে দেখা গেছে—এসপি সম্রাট মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানের স্বাক্ষর ও ‘এসএস-ওকে’ বা ‘অপস-ওকে’ লেখা থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, বোর্ডিং পাসে এ ধরনের অনুমতিসূচক চিহ্ন দেওয়ার নিয়ম নেই। এগুলো সম্পূর্ণ অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রতীক।
একজন নিয়মিত বিদেশযাত্রী বলেন, ইমিগ্রেশন জড়িত না থাকলে নকল কাগজপত্র নিয়ে কেউ দেশ ছাড়তে পারে না। আমরা বৈধ কাগজপত্র নিয়েও হয়রানির শিকার হই।
২৮ অক্টোবর থেকে শুরু করে নভেম্বরের বিভিন্ন তারিখে মালয়েশিয়া, ব্যাংকক, কলম্বো যাওয়ার বেশ কয়েকজন যাত্রীর বোর্ডিং পাসে একই কোড ও একই স্বাক্ষর পাওয়া গেছে। গণমাধ্যমের হাতে শতাধিক বোর্ডিং পাসের কপি রয়েছে।
কথা বলে জানা গেছে, নড়াইলের রতিন শিকদার তিনবার মালয়েশিয়া গিয়ে তিনবারই ফেরত এসেছেন। দীপু প্রামাণিক, নাজমুল বেপারি, আল আমিনসহ অনেকেই ৩ থেকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়ে বিদেশে গিয়েও প্রতারিত হয়েছেন।
বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, এসপি সম্রাট মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান এসবি থেকে বদলি হলেও আগের পদেই থেকে গিয়ে সিন্ডিকেট আরও বিস্তৃত করেন। জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে দৈনিক শতাধিক যাত্রীকে অবৈধ ছাড়পত্র দেন তিনি—যা দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদক সেজে যোগাযোগ করলে ফারুক শেখ ৮০–৮৫ হাজার টাকার বিনিময়ে সব নকল কাগজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। রাজনৈতিক মামলা থাকলেও সমস্যা হবে না বলে জানান তিনি।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেছেন, বৈধভাবে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ থাকলে জালিয়াতি বাড়ে। দক্ষ কর্মকর্তা ও প্রযুক্তি ছাড়া এটি বন্ধ করা কঠিন।
এসপি সম্রাট মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সবকিছু স্ক্যানিং করে ঢোকানো হয়। ফারুককেও চিনেন না দাবি করেন তিনি।
এয়ার ক্লাউডসের এমডি মো. ফারুক শেখও গণমাধ্যমের প্রশ্নে সব অস্বীকার করেন।
খবরওয়ালা/টিএসএন