খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 1শে চৈত্র ১৪৩২ | ১৫ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন এক প্রযুক্তিগত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের উত্তেজনাপূর্ণ সামরিক পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক আইন, নৈতিকতা ও মানবাধিকারের প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি বড় সামরিক অভিযান শুরুর ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কাজ থেকে বাদ দেয়। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কীভাবে হবে এবং এর নৈতিক সীমা কোথায়—এ নিয়ে সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের সামরিক বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ ও আইনবিদদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কতটা বৈধ এবং কতটা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। বিশেষ করে এমন অস্ত্রব্যবস্থা, যা মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নিজে থেকে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ ধরনের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি তৈরির উদ্যোগও চলছে।
বিশেষজ্ঞ মাইকেল হোরোভিটজ মনে করেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন এত দ্রুত হচ্ছে যে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা তৈরি সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। আরেক বিশেষজ্ঞ ক্রেগ জোন্স সতর্ক করে বলেন, যদি এখনই সঠিক নীতিমালা তৈরি না করা যায়, তবে ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে সাধারণ মানুষের হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী স্বীকার করেছে যে তারা তথ্য বিশ্লেষণ ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, বিপুল পরিমাণ তথ্য খুব দ্রুত বিশ্লেষণ করতে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি সৈন্যদের সহায়তা করছে।
এই প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো একটি উন্নত চিত্র বিশ্লেষণ ব্যবস্থা, যা আকাশ থেকে তোলা ছবি বা ভিডিও দেখে সম্ভাব্য শত্রু অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি, সরঞ্জাম পরিবহন, তথ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নিচের সারণিতে যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কয়েকটি প্রধান ব্যবহার তুলে ধরা হলো—
| ব্যবহার ক্ষেত্র | কার্যকারিতা |
|---|---|
| তথ্য বিশ্লেষণ | বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করা |
| লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ | ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য শত্রু অবস্থান নির্ধারণ |
| ড্রোন পরিচালনা | আকাশে নজরদারি ও আক্রমণ পরিকল্পনায় সহায়তা |
| সরঞ্জাম পরিবহন | সৈন্যদের মালামাল ও সরঞ্জাম সরবরাহের পরিকল্পনা |
| যুদ্ধক্ষেত্র সিদ্ধান্ত | দ্রুত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কৌশল নির্ধারণ |
তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষকদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। দক্ষিণ ইরানের মিনাব এলাকায় একটি স্কুলে সাম্প্রতিক বোমা হামলায় ১৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই শিশু। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের পর থেকে ইরানে মোট নিহতের সংখ্যা অন্তত এক হাজার তিনশ ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা গেছে।
অনেকের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করলে আক্রমণ আরও নিখুঁত হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের প্রাণহানি কমতে পারে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইউক্রেন ও গাজার সংঘাতে ড্রোন পরিচালনা এবং শত্রু শনাক্তকরণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হলেও সেখানে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।
এই পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থাকে ঘিরে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে বলা হয়েছে, কোনো অস্ত্র ব্যবস্থাকে অবশ্যই সৈন্য ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হতে হবে। কিন্তু সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর অস্ত্র এখনো সেই মানদণ্ডে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।
অন্যদিকে সামরিক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতবিরোধও বাড়ছে। সম্প্রতি চীন সতর্ক করে বলেছে, মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত কোনো অ্যালগরিদমের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। তাদের মতে, যুদ্ধের নৈতিকতা ও জবাবদিহি বজায় রাখতে মানুষের নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি এই প্রযুক্তির ব্যবহার যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে যুদ্ধ আরও স্বয়ংক্রিয় ও অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসন বজায় রাখা।