খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ৫ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
২০২৪ সালের জুলাই আগস্টের পর গত এক বছরে চরম অবনতি ঘটেছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সাংস্কৃতিক নিধন-এই সব মিলিয়ে দেশে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অস্থিরতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জুলাই ২০২৪-এর পর তৈরি হওয়া প্রশাসনিক শূন্যতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশে এক নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদী সহিংসতা ও অপসংস্কৃতির বিস্তার ঘটিয়েছে।
মব সহিংসতা ও পিটিয়ে হত্যা
গত বছরের জুলাই–আগস্টের পর বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম ‘মব সহিংসতা’। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো, চাঁদাবাজির বৈধতা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে এই মব। এটি এখন অপসংস্কৃতির অবয়ব ধারণ করে সমাজের নানা স্তরে গভীরভাবে শিকড় গজিয়েছে। প্রতিশোধ, দখলদারিত্ব, প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে মব।
জুলাইর ‘ইনসাফ’ নামক এক প্রতিশোধমূলক দর্শন সমাজে ছড়ানো হচ্ছে। মব তৈরি করে মানুষ হত্যা, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, এসবই ঘটছে তথাকথিত ‘ন্যায়বিচার’-এর নামে। এটি এক ধরনেরফ্যাসিবাদী জুলুম।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যানুসারে, গত এক বছরে বাংলাদেশে প্রায় ২০০টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রায় ১৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু শেষ ছয় মাসেই (ফেব্রুয়ারি–জুলাই) ১৪১টি ঘটনায় মারা গেছে ৮৩ জন। অথচ এই ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই থেকে গেছে বিচারের বাইরে; অপরাধীরা পেয়েছে দায়মুক্তি।
চাঁদাবাজির উত্থান
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়—বিশেষ করে জামায়াত বিএনপি এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী নেতাদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। গত এক বছরে শুধুমাত্র ঢাকাতেই ১,৩৫০টির মতো চাঁদাবাজির মামলা রেকর্ড হয়েছে। রাস্তাঘাট, বাজার, গুদাম, নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রকল্প-কোনো স্থানই রেহাই পায়নি। রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে চাঁদাবাজি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।
ধর্ষণ ও নারী–শিশু নির্যাতন
পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে, গত এক বছরে দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৬ হাজার। এর মধ্যে শত শত শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শুধু জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রেকর্ডকৃত মামলা ২,৭০০ ছাড়িয়েছে। বাস্তব সংখ্যাটা আরও ভয়াবহ, কারণ সামাজিক ভয়, কলঙ্ক ও প্রতিক্রিয়ার ভয়ে সামনে আসেনা বহু ঘটনা।
থানায় হামলা, অস্ত্র লুট, পুলিশ হত্যা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ও এরপর সারাদেশে প্রায় ৫০০টি থানা, ফাঁড়ি, আদালত ও সরকারি স্থাপনায় সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় অস্ত্র লুট, পুলিশের ওপর হামলা এবং পুলিশ সদস্যদের হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
৫ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় সংঘটিত এক হামলায় ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। তাদের মধ্যে ১৩ জনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও তিনজনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। আহত অনেকেই চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান।
ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানায় হামলার ঘটনায় অন্তত ৬ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন এবং চারটি পুড়িয়ে দেওয়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। থানাটি গুরুতরভাবে ধ্বংস হয়।
চট্টগ্রামসহ সারাদেশে গত ছয় মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ২২৫টি। এসব হামলার মধ্যে রয়েছে অস্ত্র ছিনতাই, ডাকাতি, ওয়াকিটকি ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া এবং প্রকাশ্য সহিংসতা।
এছাড়া পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া প্রায় দেড় হাজার আগ্নেয়াস্ত্র ও আড়াই লাখের বেশি গুলি এখনো উদ্ধার করা যায়নি। এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে গেছে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে।
গণভবনের দায়িত্বে থাকা এসএসএফ সদস্যদের কাছ থেকে লুট হওয়া অত্যাধুনিক ৩২টি ভারী অস্ত্রও এখনো উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড, অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, বেতার যোগাযোগের যন্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ।
অন্যদিকে, চলমান আন্দোলনের সময় জেল ভেঙে পালিয়ে যাওয়া ২৭ জন জঙ্গিও এখনো অধরা।
মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক নিদর্শন ধ্বংস
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের পর থেকে ‘একাত্তরকে চব্বিশ দিয়ে ঢেকে ফেলার’ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সারাদেশে ধ্বংস করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, ম্যুরালসহ একাত্তরের বিভিন্ন প্রতীক। বিভিন্ন স্থাপনার নতুন নামকরণের মাধ্যমে একাত্তরকে চাপা দিয়ে ‘চব্বিশ’কে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে।
এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই ২০২৫ সালের ৫ ও ৮ ফেব্রুয়ারি জনতার মব গঠন করে বুলডোজার দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
একইসঙ্গে সাঁওতাল বিদ্রোহের স্মারক সিধু-কানুর ভাস্কর্য, বেগম রোকেয়ার ভাস্কর্য এবং ময়মনসিংহের শশী লজের ‘ভেনাস’ ভাস্কর্যও ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও জীবনানন্দ দাশের নামে থাকা একাডেমিক ভবনগুলোর নামও পরিবর্তন করা হয়েছে।
সরকারের নীরবতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণ
সরকারি নিষ্ক্রিয়তা ও পক্ষপাতমূলক নীরবতা এই সহিংসতার পৃষ্ঠপোষকতায় পরিণত হয়েছে। হামলাকারীরা দায়মুক্তি পাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিচারের মুখোমুখি না হওয়া ঘাতকেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিচারব্যবস্থা এখনও যেন জুলাইয়ের ‘আগুনঘোর’ থেকে বের হতে পারেনি।
একাত্তরের ইতিহাস ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—একটি গোষ্ঠী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ২০২৪ সালের ঘটনার আড়ালে ঢেকে দিতে চাইছে। ভাস্কর্য, ম্যুরাল, স্মারক—সবকিছুই ধ্বংস করে নতুন এক ‘মুক্তির প্রতীক’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধ ছিল বহুস্বরের সংগ্রাম—কোনো একক দলীয় বয়ান নয়।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে এক ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, যেখানে মব সহিংসতা, সাংস্কৃতিক নিধন, রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও আইনের অপপ্রয়োগ একত্রে সমাজকে গ্রাস করছে।
খবরওয়ালা/এমএজেড