খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে পৌষ ১৪৩২ | ৪ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
চট্টগ্রামের বন্দরনগরীতে এক দুঃসাহসিক অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। কোটি টাকা চাঁদা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা পুলিশের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজরদারি চালিয়ে এক ব্যবসায়ীর বাসভবনে গুলিবর্ষণ করেছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টায় চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরা এলাকায় চট্টগ্রামভিত্তিক স্মার্ট গ্রুপের মালিক ও সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের বাসভবনে এই হামলা চালানো হয়। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে ভারী অস্ত্রসহ পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও সন্ত্রাসীরা নির্বিঘ্নে ১৫ রাউন্ড গুলি ছুড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ঘটনার বিবরণ ও পুলিশের নির্লিপ্ততা
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সকাল ৭টা ২৪ মিনিটে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে করে আটজন মাস্কধারী সন্ত্রাসী এলাকায় প্রবেশ করে। পাঁচজন যুবক বাড়ির সামনের অংশে এবং তিনজন পেছনের অংশে অবস্থান নেয়। প্রায় ছয় মিনিট ধরে গুলিবর্ষণের পর তারা নিরাপদে গাড়িতে উঠে বাকলিয়া এক্সেস রোড হয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, ওই এলাকায় পুলিশের একটি অস্থায়ী চেকপোস্ট থাকলেও ঘটনার সময় শীতের অজুহাতে দায়িত্বরত চার পুলিশ সদস্য পাশের একটি স্কুলের ভেতরে অবস্থান করছিলেন। সন্ত্রাসীরা পুলিশের এই অনুপস্থিতির সুযোগটি নিখুঁতভাবে কাজে লাগায়। এমনকি গুলির শব্দের পরও পুলিশ সদস্যরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাননি।
সন্ত্রাসী সাজ্জাদ বাহিনীর প্রভাব ও আতঙ্ক
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা। বর্তমানে প্রবাসে পলাতক এই সন্ত্রাসীর বাহিনী চট্টগ্রামের পাঁচটি থানায় রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামে অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে এই বাহিনীর নাম জড়িয়েছে।
সন্ত্রাসী সাজ্জাদ বাহিনীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চিত্র
| অপরাধের ধরন | প্রভাব ও সংশ্লিষ্টতা | ভুক্তভোগী অঞ্চল |
|---|---|---|
| চাঁদাবাজি | কোটি টাকা দাবি, অনাদায়ে বাসভবনে গুলিবর্ষণ। | চন্দনপুরা, চকবাজার। |
| হত্যাকাণ্ড | আধিপত্য বিস্তার ও ভাড়ায় খুনের জন্য পরিচিত। | চান্দগাঁও, বায়েজিদ, পাঁচলাইশ। |
| সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক | ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত সাজ্জাদ আলীর কমান্ড। | চট্টগ্রাম মহানগর ও হাটহাজারী। |
| অস্ত্রের মহড়া | পুলিশের চেকপোস্টের কাছেই ভারী অস্ত্রের ব্যবহার। | নগরীর জনবহুল এলাকা। |
| জনমনে প্রভাব | পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ বর্তমানে আতঙ্কে রয়েছে। | রাউজান ও সংশ্লিষ্ট এলাকা। |
ভিকটিমের রাজনৈতিক পরিচয় ও রহস্যময় নীরবতা
হামলার শিকার মুজিবুর রহমান চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, দেড় মাস আগে থেকে বিদেশি নম্বর থেকে কল করে তাঁর কাছে বড় অঙ্কের চাঁদা চাওয়া হচ্ছিল। তবে অদ্ভুত বিষয় হলো, নিজের বাড়িতে ১৫ রাউন্ড গুলি বর্ষণের পরও তিনি কোনো মামলা বা লিখিত অভিযোগ করতে রাজি নন। পুলিশের কাছে তিনি জানিয়েছেন, তিনি কোনো অপরাধ করেননি বিধায় আতঙ্কেও নেই।
সিএমপির কঠোর নির্দেশ ও বাস্তব পরিস্থিতি
সম্প্রতি চট্টগ্রামে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ সন্ত্রাসীদের দেখামাত্র ‘ব্রাশফায়ার’ করার মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন। টহল পুলিশকে এসএমজি এবং কর্মকর্তাদের পিস্তল ব্যবহারের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। তবে চন্দনপুরার এই ঘটনায় পুলিশের কাছে এসএমজি থাকা সত্ত্বেও তারা সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা নিয়ে খোদ পুলিশ বিভাগের ভেতরেই তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে ডিবিসহ পুলিশের একাধিক টিম হামলাকারীদের শনাক্ত ও ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি উদ্ধারে কাজ করছে।