খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশে খুব কম ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁদের উপস্থিতি জনমতকে নাড়িয়ে দিতে পারে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম খালেদা জিয়া। ঢাকার একটি হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি যে দৃশ্য গত কয়েকদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, তা এই অশীতিপর নেত্রীকে ঘিরে জনমানসে থাকা গভীর আবেগেরই প্রতিফলন।
সমাজের নানা শ্রেণিপেশার মানুষ ফুটপাত, আঙিনা এবং সামনের সড়কে জড়ো হচ্ছেন—কারও হাত প্রার্থনায় উঁচু, কারও কণ্ঠ নীরব শ্রদ্ধায় পূর্ণ। বহু দশক ধরে তিনি দেশের উত্তাল রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু।
রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক, মানুষের মনে যে আবেগ জেগে উঠেছে তা আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। বাংলাদেশের অনেকে এখনো তাঁকে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে দেখেন। স্মৃতি আর অনুভূতিতেই টিকে আছে সেই ভালোবাসা।
ভুলে যাওয়া সহজ যে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী রাজনীতিক হওয়ার আগেও খালেদা জিয়া ছিলেন সাধারণ জীবনযাপনকারী একজন নারী। স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তাঁকে হঠাৎ করে এমন এক ইতিহাসের পথে নিয়ে যায়, যার জন্য তাঁর কোনও প্রস্তুতি ছিল না।
তারপরও তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। গ্রেপ্তার, নজরদারি, ভয়ভীতির মধ্য দিয়ে পথ চলেছেন। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি হয়ে ওঠেন গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের প্রতীক। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন, বারবার আটক হন, নিঃসঙ্গতা সহ্য করেন—তবুও স্বৈরাচারের কাছে মাথা নত করেননি।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে তাঁর সংগঠিত ভূমিকা সামরিক শাসনের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নির্বাচন চিহ্নিত করে দীর্ঘ সামরিক প্রভাবের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন।
তাঁর শাসনে অগ্রাধিকার পেয়েছিল সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবন—শিক্ষার জন্য খাদ্য, গ্রামীণ সেবামূলক কর্মসূচি, কর্মসংস্থান, কাঠামোগত সংস্কার—যা বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে আরও উদার অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেয়।
সমালোচকরা তাঁকে সতর্ক রাজনীতিবিদ বলেছেন, অনুরাগীরা স্থির হাতের নেতা। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে তিনি নেতৃত্বের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর অবস্থান অনন্য। মুসলিম বিশ্বের প্রথমদিকের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী নেতাদের একজন তিনি।
তাঁর নেতৃত্ব ছিল ব্যক্তিপূজামুক্ত, রাজবংশীয় নয়, আবার কঠোর সম্রাজ্ঞীর মতোও নয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে কেউ কেউ ক্ষমতা-কেন্দ্রীকরণ হিসেবে দেখলেও খালেদার শৈলী ছিল সংযমী, নীরব, ভারসাম্যপূর্ণ। এজন্য অনেকেই তাঁকে ‘জেন্টল লেডি’ হিসেবে অভিহিত করেন—যেখানে ভদ্রতা ও শালীনতা শক্তির প্রকাশ।
তাঁর নেতৃত্ব ’৮০ ও ’৯০ দশকের গণতান্ত্রিক উত্তরণের স্মৃতি বহন করে—যখন গণতন্ত্র ছিল বাস্তব অনুভূতি। তাঁর সময়কার নেতৃত্ব অনেকের চোখে আজকের তুলনায় বেশি সহিষ্ণু, বহুমাত্রিক ও উন্মুক্ত।
এ কারণেই হাসপাতালে তাঁর শয্যার পাশে মানুষের ভিড় কেবল একজন অসুস্থ নেত্রীকে ঘিরে দুশ্চিন্তা নয়—এটি প্রতিফলন করে বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার: প্রতিহিংসামুক্ত, কম দমনমূলক, কম অসহিষ্ণু রাজনৈতিক পরিবেশ।
তাঁর অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রতিক্রিয়া যেন নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি—তাঁর অবদান স্মরণ এবং শালীন রাজনীতির জন্য আকুলতা। যাঁরা তাঁকে ভোট দেননি, তাঁরাও আজ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। পূর্বের প্রতিপক্ষরাও আরোগ্য কামনা করছেন।
বাংলাদেশের দীর্ঘ মেরুকরণে বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও তাঁর অসুস্থতা সেই বিভাজনকে সাময়িকভাবে হালকা করেছে। মনে করিয়ে দিয়েছে—তিনি ছিলেন এমন এক নারী, যিনি ব্যক্তিগত বিপর্যয়, রাজনৈতিক ঝড় ও সমালোচনা শান্তভাবে মোকাবিলা করেছেন।
তিনি কখনো কঠোর শাসক ছিলেন না, ছিলেন না জ্বালাময়ী বক্তা; বরং শাসন করেছেন মাতৃসুলভ মর্যাদায়—যা মানুষের হৃদয়ে ছাপ ফেলেছে।
হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষের কথায় আদর্শ নয়, বরং মর্যাদা ও শিষ্টাচারের কথা উঠে আসে। তাঁরা তাঁকে মানবিকতার প্রতীক বলে মনে করেন।
তিনি এই সংকট থেকে ফিরুন বা না ফিরুন—বাংলাদেশ তাঁকে স্মরণ করবে কেবল একজন রাজনৈতিক কৌশলী হিসেবে নয়, বরং বিনয়ে আচ্ছাদিত নাগরিক আকাঙ্ক্ষার ধারক হিসেবে। অনেকের কাছে তিনি এক ভিন্ন নেতৃত্বশৈলীর প্রতীক—যা কম প্রতিশোধপরায়ণ ও কম হিসাবি।
সবশেষে মূল্যায়ন হয়—কত পদ পেয়েছেন তা দিয়ে নয়; বরং জাতির স্মৃতিতে কত গভীর আবেগ রেখে গেছেন তা দিয়েই।
(লেখক: নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার। অনলাইন এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)
খবরওয়ালা /এসএস