খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ওপর চলমান দমন-পীড়ন ও আইনি হয়রানির চক্র ভেঙে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সংস্থাটি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার তাগিদ দিয়েছে। বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর ২০২৬ সালের ২ জুন সিপিজের দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে এই সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিগত দুই বছরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তিনটি ভিন্ন শাসনব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করেছে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দীর্ঘস্থায়ী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এরপর নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে এবং তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
সিপিজের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রতিটি শাসনাবস্থার পরিবর্তনের সময় সাংবাদিকদের ওপর নিয়মতান্ত্রিকভাবে আক্রমণ, মামলা, নজরদারি ও অপবাদ দেওয়ার সংস্কৃতি দেখা গেছে। বিশেষ করে পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। সম্প্রতি দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, পুলিশ দেশজুড়ে সাংবাদিকদের অতীত রেকর্ড যাচাই ও তাদের জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।
সংস্থাটির এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির সমন্বয়কারী কুনাল মজুমদার বলেন, বাংলাদেশে ক্ষমতার প্রতিটি নতুন পরিবর্তনের সাথে সাথে পূর্ববর্তী সরকারের আমলের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তাঁর সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কোনো বাস্তবসম্মত বা অর্থপূর্ণ অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।
বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস ১০টি সুনির্দিষ্ট সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে, যা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা ও গ্রেপ্তার বন্ধ করা: সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাসমূহ প্রত্যাহার করতে হবে। গণহারে প্রথম তথ্য বিবরণী (এফআইআর) ও একাধিক মামলা দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করার পাশাপাশি সাংবাদিকতার কারণে অভিযুক্তদের আইনি জামিনে বাধা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একাত্তর টেলিভিশনের ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু এবং ভোরের কাগজের শ্যামল দত্তের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁরা ২০২৪ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বর মাস থেকে কারাবন্দী আছেন। ২০২৬ সালের ১১ মে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদকে অধিকাংশ মামলায় জামিন দিলেও অন্যান্য মামলার জটিলতায় তাঁরা এখনও কারাগার থেকে মুক্তি পাননি।
২. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অপব্যবহার রোধ: সাধারণ সাংবাদিকতার কাজকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের সাথে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের ধারা বন্ধ করতে হবে এবং বর্তমান মামলাগুলো নিরপেক্ষভাবে পুনঃমূল্যায়ন করতে হবে।
৩. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের জবাবদিহি: যেকোনো সরকারের সময়কালে সংঘটিত সাংবাদিক হত্যা, শারীরিক আক্রমণ ও হয়রানির প্রতিটি ঘটনার স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। তবে এই বিচার প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার পরিহার করার সুপারিশ করা হয়েছে।
৪. সহিংসতা ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠী থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা: বাংলাদেশে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক দল ও উগ্রবাদী সমর্থকদের সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশের দুটি বৃহৎ সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালানো হয়, যার ফলে তাদের ছাপা ও অনলাইন সংস্করণ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৫ সালে রাজনৈতিক কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ১০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশের সাথে বিএনপি ও ছাত্রদলের কর্মী-সমর্থকদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সরকারকে এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
৫. সাইবার আইনসমূহের জরুরি সংস্কার: বর্তমান ও পূর্ববর্তী সাইবার সংক্রান্ত আইনগুলো সংবাদমাধ্যম দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই আইনগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইনের আওতায় থাকা মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে।
৬. সন্ত্রাসবিরোধী ও বিশেষ আইনের অপব্যবহার রোধ: ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মতো কঠোর আইনগুলো সাংবাদিকদের দমনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে তাঁর টেলিভিশন বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের কারণে এই আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করা হয়, যদিও পরে তিনি জামিন পান। এর আগে ২০২১ সালের মে মাসে রোজিনা ইসলামকে ১৯২৩ সালের আইনের অধীনে গোপন নথি চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এই আইনগুলো বাতিল বা মৌলিক সংশোধন করা অত্যন্ত জরুরি।
৭. প্রস্তাবিত গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ প্রত্যাহার: ২০২৬ সালের জাতীয় সম্প্রচার কমিশন ও জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন সংক্রান্ত খসড়া অধ্যাদেশগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মতো গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি করছে। সরকারকে এই অধ্যাদেশগুলো বর্তমান আকারে গ্রহণ না করে, অন্তর্বর্তী সরকারের গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশসমূহ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
৮. ঔপনিবেশিক আমলের দমনমূলক আইন বাতিল: ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির মানহানির ধারা এবং ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট বাতিল করতে হবে। এছাড়া ২০০১ সালের বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের নজরদারি ও আড়ি পাতার বিধানগুলো সংস্কার করে আদালতের তদারকি বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পরোয়ানা ছাড়া আড়ি পাততে না পারে।
৯. অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল ও হয়রানিমূলক মামলা বন্ধ: সাংবাদিকদের সরকারি অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের বর্তমান একপাক্ষিক পদ্ধতি সংস্কার করতে হবে এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কৌশলগত হয়রানিমূলক মামলা প্রতিরোধে আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
১০. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার বন্ধ করা: সাংবাদিকদের বিভিন্ন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় তকমা (যেমন ভারতপন্থী, ইসলামবিরোধী বা দেশদ্রোহী) দিয়ে অপপ্রচার চালানো বন্ধ করতে হবে। এই ধরনের অপপ্রচারের কারণে অনেক সাংবাদিক দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। সরকারকে স্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে যে স্বাধীন সাংবাদিকতা একটি সাংবিধানিক অধিকার এবং উসকানিদাতাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
সিপিজের প্রতিবেদনে উল্লেখিত প্রধান প্রধান ঘটনা ও সাংবাদিকদের বর্তমান আইনি অবস্থা নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ভুক্তভোগী সাংবাদিক / গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান | ঘটনার বিবরণ ও বর্তমান আইনি অবস্থা | সংশ্লিষ্ট আইন বা ঘটনার ধরন |
| ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদ (একাত্তর টেলিভিশন) | ২০২৪ সালের আগস্ট/সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে আছেন। ২০২৬ সালের ১১ মে হাইকোর্ট থেকে অধিকাংশ মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলার কারণে কারামুক্তি মেলেনি। | রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একাধিক মামলা ও ঢালাও এফআইআর। |
| মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্ত (একাত্তর টেলিভিশন ও ভোরের কাগজ) | ২০২৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস থেকে একটানা কারাবন্দী অবস্থায় আছেন এবং জামিন পাননি। | রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক আইনি প্রক্রিয়া। |
| আনিস আলমগীর (টেলিویزیণ আলোচক ও সাংবাদিক) | ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যের জন্য গ্রেপ্তার হন, পরবর্তীতে জামিন পান। | সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯। |
| রোজিনা ইসলাম (অনুসন্ধানী সাংবাদিক) | ২০২১ সালের মে মাসে গোপন সরকারি নথি সংগ্রহ ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার ও সাময়িক কারাবরণ করেন। | অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩। |
| প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার (সংবাদপত্র কার্যালয়) | ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এই দুটি প্রধান সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়, যার ফলে প্রকাশনা সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়। | রাজনৈতিক সমর্থকদের সংগঠিত সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগ। |
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস পরিশেষে উল্লেখ করেছে যে, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য স্বাধীন সাংবাদিকতা অপরিহার্য। সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণকারীদের এবং অপপ্রচারের মাধ্যমে সহিংসতায় উসকানিদাতাদের অবিলম্বে জবাবদিহির আওতায় এনে সরকার গণমাধ্যমের সুরক্ষায় তাদের অঙ্গীকার প্রমাণ করতে পারে।