খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: 19শে আষাঢ় ১৪৩২ | ৩ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ইরান-ইসরায়েল সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে গুপ্তচর সন্দেহে বিপুলসংখ্যক আফগান নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে ইরান। সংঘাত ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের অজুহাতে ইরান সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)।
ইরানে অবস্থানরত ৩৫ বছর বয়সী আফগান নাগরিক এনায়েতুল্লাহ আসগরি জানিয়েছেন, ভবন নির্মাণকেন্দ্রে কাজ হারানোর পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগও আনা হয়। এ অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁকে ইরান ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।
জাতিসংঘ জানায়, চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজারের বেশি আফগানকে ফেরত পাঠাচ্ছে, যা আগের তুলনায় প্রায় ১৫ গুণ বেশি।
ইরানের সরকারপক্ষের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। অবৈধভাবে অবস্থান করা বিদেশিদের নিজ দেশে ফিরতেই হবে।’ তিনি এটিকে ‘বিতাড়ন’ না বলে ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখতে আহ্বান জানান। তবে গুপ্তচর ধরার অভিযানের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।
অন্যদিকে, জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, আফগানদের লক্ষ্য করে যেভাবে ধরপাকড় চালানো হচ্ছে, তা তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।
ইউএনএইচসিআরের আফগানিস্তান প্রতিনিধি আরাফাত জামাল বলেন, ‘আমরা বুঝি, ইরান একটি ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু আফগানদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে বলেও মনে হয়।’
আফগানিস্তানে ফিরে গিয়ে হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন বিতাড়িত আফগানরা। এনায়েতুল্লাহ আসগরি বলেন, ‘একটা ভাড়া বাসা খুঁজে পাওয়াও কঠিন। কোনো কাজ নেই। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর দেশের অবস্থাও ভালো না। জানি না কী করবো।’
ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর প্রায় ২৬ লাখ আফগান ইরানে বসবাস করছিলেন, যাঁদের বেশিরভাগেরই বৈধ কাগজপত্র ছিল না। তবে বিতাড়ন শুধু অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে নয়, কিছু বৈধ অভিবাসীকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২৬ বছর বয়সী আফগান নাগরিক আহমাদ ফাওয়াদ রহিমি জানান, তাঁর বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ইরানের একটি আটক কেন্দ্রে রাখা হয়। সেখানে বন্দীদের অমানবিক পরিস্থিতিতে রাখা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন—খাবার ও পানির অভাব ছিল, মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয় এবং মুক্তি পেতে অর্থ দিতে হয়েছে।
ফাওয়াদ বলেন, ‘আগে ধরা পড়লে সতর্ক করা হতো, কিন্তু এখন সবাইকে গুপ্তচর ভাবা হচ্ছে। তারা বলছে, আফগানরা শত্রুর পক্ষ নিয়েছে। তাই তাঁদের ফিরিয়ে দিচ্ছে।’
ইরান ও ইসরায়েলের ১২ দিনের সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি হলেও এর প্রভাব আফগানদের ওপর পড়েছে সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, ইরান ও পাকিস্তান থেকে আফগানদের ফেরত পাঠানোর ফলে দেশটি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে, যেখানে অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তাও ক্রমশ কমছে।
২০২৫ সালের শুরুতেই ইরান ও পাকিস্তান থেকে অন্তত ১২ লাখ আফগান ফিরে এসেছেন। তাদের অনেকেই ফিরে এসেছেন একেবারে খালি হাতে—শুধু পরনের কাপড় ও হাতে থাকা অল্প কিছু মালপত্র নিয়ে।
আফগানিস্তানে বর্তমানে সহায়তা সংকট চরমে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির ব্যাংক খাত কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক অনুদানও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে—তিন বছর আগের তুলনায় যা এখন এক চতুর্থাংশেরও কম।
এই পরিস্থিতিকে জাতিসংঘ আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখছে।
সূত্র: রয়টার্স
খবরওয়ালা/আরডি