খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলা গানের ইতিহাসে এমন অনেক গান আছে, যেগুলো আজও প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ থেকে আশির দশকের সেই সব গান শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে আজও সমানভাবে বেঁচে আছে। সেই সময়ের সুরের ফেরিওয়ালাদের নাম মানুষ বারবার উচ্চারণ করলেও, গানের পেছনের অমর লেখকের নাম অনেকেই ভুলে যান। এই সকল গানকে স্থায়িত্ব দিয়েছে যে কলম—তার মালিক ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, যিনি বাংলা গানের ইতিহাসে এক দীপ্তিমান গীতিকবি।
সর্বকালের সেরা বিশটি বাংলা গানের তালিকায় তার লেখা দুইটি গান— কফি হাউসের সেই আড্ডাটা ও মুছে যাওয়া দিনগুলি—অবস্থান পাওয়াই তার সৃষ্টিশীলতার প্রমাণ। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করা গৌরীপ্রসন্ন কলেজ জীবনে কালীদাসের মেঘদূত ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। তিনি মূলত কবি হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভাগ্যের টানে বাংলা গানের ভুবনে হয়ে ওঠেন এক অনন্য গীতিকবি।
তরুণ বয়সে অনুপম ঘটকের সুরে অগ্নিপরীক্ষা সিনেমার জন্য তিনি লেখেন ‘কে তুমি আমারে ডাকো’ এবং ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’। অনুপম ঘটকের সুরের সঙ্গে তিনি যে গভীরভাবে মিশে যেতে পেরেছিলেন, তা আজও সঙ্গীতপ্রেমীরা স্মরণ করেন। পরে শচীন দেববর্মণ তাকে নিয়মিত গান লেখার উৎসাহ দেন। তার জন্য লেখা ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’ গানটিতে তিনি অদ্ভুত শক্তিশালী লাইন সৃষ্টি করেন—যেখানে প্রেম, ব্যথা ও রাগ এক অনির্বচনীয় চিত্রকল্পে ধরা পড়ে।
তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল নচিকেতা ঘোষের সঙ্গে, এবং এই জুটির সৃষ্টি বহু কালজয়ী গান—যেমন ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই’, ‘মৌবনে আজ মৌ জমেছে’, ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’ ইত্যাদি। এসব সৃষ্টিতে গৌরীপ্রসন্নের কবিত্ব কখনোই লুকিয়ে থাকে না; বরং স্পষ্ট হয় তার ভাষার সংবেদনশীলতা ও গভীরতা। প্রেমের সূক্ষ্ম অনুভূতি থেকে বিদ্রোহের চেতনা—সবই তার লেখায় সমান স্বচ্ছতায় প্রতিফলিত হয়েছে।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, রাহুল দেব বর্মণ, বাপ্পী লাহিড়ী—সবাইয়ের জন্যই তিনি অসংখ্য গান লিখেছেন। ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘যে বাঁশি ভেঙে গেছে’, ‘এই রাত তোমার আমার’—প্রতিটি গানই বাংলা সংগীতের ইতিহাসে মাইলফলক। কিশোর কুমারের জন্য লেখা ‘সেদিনও আকাশে ছিলো কত তারা’ গানটি লেখা হয়েছিল সমুদ্রসৈকতে বসে জন্মানো এক অতীত স্মৃতির বেদনাকে কেন্দ্র করে।
তার লেখা মানুষ খুন হলে পরে, আমি যামিনী তুমি শশী হে, আমি যে এ জলসাঘরে—এগুলোও তার মুন্সিয়ানা তুলে ধরে। উত্তম কুমারের অনুরোধে লেখা ‘এই মোম জোছনায়’ গানটি তার কবিত্বের এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সিগারেটের প্যাকেটে লিখেছিলেন ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে’। পরে তিনি লিখলেন কফি হাউসের সেই আড্ডাটা—যা তার ক্যান্সারাক্রান্ত অবস্থায় লেখা এক অমর সৃষ্টি।
১৯২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর পাবনার গোপালনগরে জন্ম নেওয়া এই গীতিকবি বাংলা গানের আকাশে তার অনন্য নক্ষত্র হয়ে রইলেন।
খবরওয়ালা /এএসএন