খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে মাঘ ১৪৩২ | ৩ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
আর্কটিক অঞ্চল তথা গ্রিনল্যান্ডের ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যখন বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ তুঙ্গে, ঠিক তখনই পশ্চিমা দেশগুলোর দাবিকে নজিরবিহীনভাবে তুচ্ছজ্ঞান করলেন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপ-চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রয়টার্স ও তাস নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি গ্রিনল্যান্ডে রাশিয়া বা চীনের সম্ভাব্য হুমকির বিষয়টিকে পশ্চিমাদের তৈরি করা এক ‘ভয়ংকর রূপকথা’ বা সাজানো গল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন।
দিমিত্রি মেদভেদেভ জোর দিয়ে বলেন, গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও চীনের নাম ব্যবহার করে যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, তার পেছনে কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং পশ্চিমা নেতারা তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা এবং ন্যাটোর সামরিক তৎপরতার যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্যই এই ধরণের কাল্পনিক বয়ান তৈরি করছেন। মেদভেদেভ বিষয়টিকে একটি মনস্তাত্ত্বিক খেলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা মূলত জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা।
তার মতে, এই বিতর্কিত বিষয়টি আটলান্টিক ঐক্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমা দেশগুলোর ভেতরেই গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দানা বাঁধছে। মেদভেদেভ ইঙ্গিত দেন যে, বড় ধরণের কোনো সামরিক সংঘাত বা ন্যাটো জোটের ভেতরে বড় ফাটল ধরার আগেই সম্ভবত কোনো শান্তিপূর্ণ উপায়ে এই সংকটের সমাধান হতে পারে। তবে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, উত্তর মেরু অঞ্চলে রাশিয়া বা চীনের কোনো আগ্রাসী পরিকল্পনা নেই।
গ্রিনল্যান্ড তার বিপুল খনিজ সম্পদ—যেমন বিরল মৃত্তিকা ধাতু (Rare Earth Elements), তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য বিশ্বশক্তির আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এর কৌশলগত অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো প্রায়ই অভিযোগ করে আসছে যে, চীন তাদের ‘পোলার সিল্ক রোড’ প্রকল্পের মাধ্যমে এবং রাশিয়া তাদের সামরিক ঘাঁটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে।
নিচে গ্রিনল্যান্ড এবং আর্কটিক অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি ও বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| পক্ষসমূহ | মূল দাবি ও কৌশলগত অবস্থান | সম্ভাব্য প্রভাব |
| পশ্চিমাবিশ্ব (ন্যাটো) | রাশিয়া ও চীন গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ ও সামরিক অবস্থান দখলের চেষ্টা করছে। | আর্কটিক অঞ্চলে ন্যাটোর সামরিক উপস্থিতি ও নজরদারি বৃদ্ধি। |
| রাশিয়া | উত্তর মেরু তাদের সার্বভৌমত্বের অংশ; পশ্চিমা দাবিগুলো রাজনৈতিক প্রচারণা বা ‘ভয়ংকর রূপকথা’। | পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক দূরত্বের সম্প্রসারণ। |
| চীন | ‘পোলার সিল্ক রোড’ বা মেরু রেশম পথের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক অংশগ্রহণ। | অঞ্চলটিতে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও প্রভাব বিস্তার। |
| গ্রিনল্যান্ড (স্বায়ত্তশাসিত) | রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সম্পদের সুষম ব্যবহারের ইচ্ছা। | বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া। |
মেদভেদেভের এই কড়া মন্তব্য পশ্চিমা প্রচারণা যুদ্ধের বিরুদ্ধে রাশিয়ার একটি দৃঢ় অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দিমিত্রি মেদভেদেভ আসলে পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে সম্ভাব্য বিভাজনকে উস্কে দিতে চাইছেন। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটি এখন আর কেবল একটি দ্বীপের মালিকানা বা স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আধুনিক ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবা খেলায় পরিণত হয়েছে। রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে ‘রূপকথা’ বলার মাধ্যমে মেদভেদেভ মূলত বিশ্ববাসীকে বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, প্রকৃত অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে পশ্চিমারাই।
উত্তরাঞ্চলীয় এই শীতল যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কার আধিপত্য বজায় থাকবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনের নীতিমালার ওপর। মেদভেদেভ মনে করেন, ভিত্তিহীন অভিযোগ দিয়ে রাশিয়াকে কোনঠাসা করা সম্ভব হবে না।