খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫
ঢাকার উত্তরার একটি বহুতল ভবনের পঞ্চম তলায় ভোররাতে ঘুম ভাঙার পর পরিবারের এক সদস্য দেখেন বিছানার পাশে একটি সাপ প্যাঁচানো অবস্থায়। আতঙ্কে পরিবারের সবাই চিৎকার করেন। পরে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনকে (BAWA) খবর দেওয়া হয়। সংস্থার রেসকিউ টিম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসে খৈয়া গোখরা সাপটি উদ্ধার করে।
সাধারণত বর্ষা মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে সাপের আক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা বেশি দেখা যায়। কিন্তু এখন নগরে, বিশেষ করে ঢাকার বনশ্রী, মেরাদিয়া, মিরপুর, আফতাবনগর, মোহাম্মদপুর, বছিলা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, আজমপুর, উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টর– এমনকি নিকেতন ও ক্যান্টনমেন্টের মতো অভিজাত এলাকায়ও সাপ দেখা দিচ্ছে। বাসিন্দারা আকস্মিকভাবে সাপ দেখে আতঙ্কিত হচ্ছেন।
উদ্ধার হওয়া সাপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভয়ংকর বিষধর খৈয়া গোখরা (ইন্ডিয়ান কোবরা), পদ্মগোখরা বা মনোকেল্ড কোবরা, ওয়ানস ক্রেট এবং রাসেল ভাইপার। ইতিমধ্যে মিরপুরের একটি বাসার তিন তলায় একজন নারী সাপের কামড়ে আহত হয়েছেন।
BAWA-এর হিসাব অনুযায়ী, গত তিন মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩২২টি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে তিনটি সাপ উদ্ধার হচ্ছে এবং এর মধ্যে ৩১৯টি বিষধর। সংস্থার আহ্বায়ক আদনান আজাদ বলেন “আমরা সব সময় প্রাণীর সুরক্ষা ও সাপ উদ্ধারে কাজ করি।
ঢাকায় সাপের উপস্থিতি বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে আদনান আজাদ ব্যাখ্যা করেন, পদ্মগোখরা ও খৈয়া গোখরা সাপের প্রজননকাল এবং পানিপ্রীতি। পূর্বে যেসব এলাকায় জলাশয় ছিল—যেমন বনশ্রী, আফতাবনগর, উত্তরখান, বছিলা—সেখানে এখন বহুতল ভবন ও রাস্তা গড়ে উঠেছে। টানা বৃষ্টিতে গর্ত ও জলাধার ভরে গেলে সাপ শুকনো স্থান খুঁজে মানুষের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। অক্টোবর মাসে পদ্মগোখরার প্রজননকাল হওয়ায় ডিম ফোটার পর বাচ্চা সাপ বের হচ্ছে। বাচ্চা সাপও বিষধর।
সাপগুলো সাধারণত নিশাচর। তাই রাত ২টা থেকে ৫টার মধ্যে বেশি দেখা যায়। রেসকিউ টিম প্রায় প্রতিরাতে কল পায়। বিভিন্ন বহুতল ভবনের নবম তলা থেকেও সাপ উদ্ধার করতে হয়েছে।
উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টর, বনশ্রী, বছিলা ও আফতাবনগর—নতুন আবাসন প্রকল্পের এলাকায় সাপ দেখা বেশি। কারণ, এই এলাকায় সবুজ অঞ্চল ও জলাশয় বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া ঘিঞ্জি ফাঁকা জায়গা ও লতানো গাছ সাপের আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
BAWA তাদের রেসকিউ কার্যক্রমের পাশাপাশি কিছু সতর্কতামূলক পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা; ঘাস-ঝোপ কাটা। উচ্ছিষ্ট খাবার যত্রতত্র না ফেলা। বাথরুম, স্টোররুম বা রান্নাঘরের নিচে অন্ধকার ও ভেজা জায়গায় নজর রাখা। সাপ দেখা গেলে নিজে কিছু না করে রেসকিউ টিমে খবর দেওয়া। শিশু ও পোষা প্রাণীর প্রতি নজর রাখা; রাতে মশারি ব্যবহার। নিচ তলায় অযথা জিনিসপত্র রাখা থেকে বিরত থাকা; ঘরে লাইট ব্যবহার।
সংস্থাটি উদ্ধারকৃত সাপগুলো বন বিভাগের নির্দিষ্ট চর ও বনাঞ্চলে অবমুক্ত করে। তবে রাজধানীর হাসপাতালগুলিতে এখনও সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের সমস্যা রয়েছে। শুধুমাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে যথেষ্ট অ্যান্টিভেনম রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, “সাপ শহর বা গ্রামের ক্ষতি করে না; বরং ইঁদুর দমন করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। সমস্যা হচ্ছে মানুষের নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস। পরিকল্পিত নগরায়ণ হলে মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সহাবস্থান সম্ভব।”
নগরে সাপের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি, নগর পরিকল্পনায় সবুজ ও জলাশয় সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।