কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ মে ২০২৫
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও দরবেশবাবা খ্যাত রহমত আলী রব্বানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জমি দখল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে স্থানীয় জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীরা।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রব্বানের সন্ত্রাসী ও দখলবাজ কর্মকাণ্ডে এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর ফলে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের দলটির ওপর আস্থা ক্রমেই কমে আসছে। এই পরিস্থিতির সুযোগে জামায়াতের নেতারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার বিকেলে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও নাগরিক কমিটির নেতৃত্বে মিরপুর উপজেলা পরিষদের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নিয়ে রহমত আলী রব্বানের গ্রেফতার দাবি করেন। তবে মানববন্ধনের পরেও রব্বানের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি।
মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালকে কার্যত পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলেছেন রহমত আলী রব্বান। রোগীদের বিভিন্ন টেস্ট বাধ্যতামূলকভাবে তার মালিকানাধীন জয়মন ক্লিনিকে করাতে বাধ্য করা হয়। হাসপাতালের খাবার সরবরাহ, ওষুধ সরবরাহসহ বিভিন্ন টেন্ডার তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এবং এসব ক্ষেত্রে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
রোগীরা আরও অভিযোগ করেছেন, প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান করানোর জন্য চিকিৎসকদের সঙ্গে দফারফা করে নিজের ক্লিনিকে পাঠান রব্বান।
সম্প্রতি বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ন্ত্রণের জন্য চেয়ারম্যান ও সচিবদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
একজন ভুক্তভোগী জানান, সাবেক এমপি কামারুল আরেফিনের প্রায় ৩০ কোটি টাকার প্রকল্প রব্বান নিজে দেখভাল করছেন এবং তার অনুগত ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে হুমকি দিয়ে লটারিভিত্তিক কাজ হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত ১ ফেব্রুয়ারি, মিরপুর বাসস্ট্যান্ড বাজারে জাসদ কর্মী জালাল উদ্দিনের মালিকানাধীন একটি দোকান জোরপূর্বক দখল করে বিএনপির কার্যালয় বানানোর অভিযোগ রয়েছে রব্বান ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সাইনবোর্ড সরানোর নির্দেশ দিলেও রব্বান প্রথমে তা অমান্য করেন। পরে দলীয় চাপে রাতের অন্ধকারে সাইনবোর্ড সরাতে বাধ্য হন।
মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে শাহাদালী ক্লিনিক ও ফার্মেসির মালিকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন রব্বান। চাঁদা না দিলে ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ক্লিনিকে লুটপাট চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়, যার ফলে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয় বলে জানা গেছে।
মিরপুর উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি আব্দুল হক চেয়াম্যান জানান, রহমত আলী রব্বান নিজের সুবিধামতো আওয়ামী লীগ ও জাসদপন্থীদের বিএনপির কমিটিতে জায়গা দিয়েছেন, অথচ ত্যাগী বিএনপি কর্মীরা উপেক্ষিত হয়েছেন। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কামারুল আরেফিনের সঙ্গে নিয়মিত হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ রাখেন। কামারুল আরেফিনের পক্ষে ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচনেও সক্রিয়ভাবে কাজ করেন রব্বান।
এমনকি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুল হালিমের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে রব্বানের নাম উঠে এসেছে, যা তৃণমূল বিএনপির মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রহমত আলী রব্বান ও তার পরিবারের লাগামহীন কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে বিএনপিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক খেসারত দিতে হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে রহমত আলী রব্বানের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
খবরওয়ালা/আরডি