খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
রাজশাহীর তানোরে এক চাঞ্চল্যকর প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে চিত্রনায়িকার সঙ্গে বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের কাছ থেকে প্রায় ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক কথিত ঘটকের বিরুদ্ধে। আধুনিক যুগের ডিজিটাল লেনদেন এবং মানুষের সহজ-সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এই অভিনব প্রতারণা সাজানো হয়েছে। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি, ২০২৬) সকালে ভুক্তভোগী বৃদ্ধ বাদী হয়ে তানোর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর তানোর উপজেলার তালন্দ ইউনিয়নের বিলশহর গ্রামের হাজী দোস্ত মোহাম্মদ (৭৫) এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। প্রতারক ঘটক আব্দুল লতিফ ওরফে ভোলা (৫৫), যিনি তানোর পৌর এলাকার ধানতৈড় মহল্লার বাসিন্দা, দোস্ত মোহাম্মদকে প্রলোভন দেখান যে তিনি একজন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকার সঙ্গে তাঁর বিয়ে দিতে পারবেন।
গত প্রায় ৮ মাস ধরে বিভিন্ন অজুহাতে এবং ‘বড় তারকাদের’ সঙ্গে যোগাযোগের খরচের কথা বলে আব্দুল লতিফ কয়েক দফায় মোট ৬ লাখ ৯৬ হাজার ২৯৫ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এই টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতারক কখনো সরাসরি নগদ গ্রহণ করেছেন, আবার কখনো বিভিন্ন বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছেন। বৃদ্ধ দোস্ত মোহাম্মদ বিয়ের আশায় এবং প্রতারকের বাকপটুতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর জীবনের সঞ্চিত এই বিশাল অংকের অর্থ তুলে দিয়েছেন।
প্রতারণা সংক্রান্ত মূল তথ্যাবলি:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| ভুক্তভোগী | হাজী দোস্ত মোহাম্মদ (৭৫ বছর)। |
| অভিযুক্ত প্রতারক | আব্দুল লতিফ ওরফে ভোলা (৫৫ বছর)। |
| প্রতারণার ধরণ | চিত্রনায়িকার সঙ্গে বিয়ের মিথ্যা প্রলোভন। |
| হাতিয়ে নেওয়া অর্থ | ৬,৯৬,২৯৫ (ছয় লাখ ছিয়ানব্বই হাজার ২৯৫) টাকা। |
| অর্থ লেনদেনের মাধ্যম | নগদ এবং বিকাশ। |
| ঘটনার সময়কাল | গত ৮ মাস যাবৎ। |
| বর্তমান আইনি অবস্থা | তানোর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের। |
ভুক্তভোগী দোস্ত মোহাম্মদ অত্যন্ত অনুতপ্ত হয়ে জানান, “আমি সরল বিশ্বাসে ভোলার কথায় প্রলুব্ধ হয়েছিলাম। সে আমাকে বড় বড় নায়িকাদের ছবি দেখিয়ে বলত তাদের সাথে আমার বিয়ে সম্ভব। সে কখনো নায়িকার জন্য গয়না কেনা, কখনো যাতায়াত খরচ বা অন্যান্য অজুহাতে দফায় দফায় টাকা চেয়েছে। ৮ মাস ধরে আমি টাকা দিয়েছি কিন্তু কোনো ফল পাইনি। এখন পরিবারের চাপের মুখে এবং সর্বস্ব হারিয়ে আমি পুলিশের শরণাপন্ন হয়েছি।”
অন্যদিকে, অভিযুক্ত আব্দুল লতিফ ওরফে ভোলা তাঁর বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য এবং কোনো পুরনো শত্রুতার জের ধরে এই সাজানো অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী এবং তথ্য-প্রমাণাদি অনুযায়ী ভোলার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মাদ শহীদুজ্জামান জানিয়েছেন, তিনি এখনো লিখিত অভিযোগটি হাতে পাননি, তবে থানায় অভিযোগ এসে থাকলে তা দ্রুত তদন্ত করা হবে। তিনি আরও যোগ করেন, “এই বয়সে এমন প্রলোভনে পড়ে প্রতারিত হওয়া দুঃখজনক। আমরা বিকাশ নম্বরের তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
এদিকে, এই নজিরবিহীন প্রতারণার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি জানিয়েছেন, আব্দুল লতিফ একজন পেশাদার প্রতারক এবং তাঁকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ মনে করছেন, হাজী দোস্ত মোহাম্মদের মতো সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে এমন প্রতারণা সামাজিকভাবেও বড় লজ্জার।
রাজশাহীর এই ঘটনাটি আমাদের সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এবং প্রতারণার নতুন কৌশলের এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের একাকীত্ব বা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যে অপরাধ চক্র গড়ে উঠছে, তা দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতাও জরুরি। জীবনের শেষ বয়সে এসে এমন বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে ধর্মীয় ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।