খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ নভেম্বর ২০২৫
পাকিস্তানি শাসকদের ভাষার ওপর নির্মম আঘাত যখন বাঙালির অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল, তখনই তরুণ চারুকলার শিক্ষার্থী ইমদাদ হোসেন উপলব্ধি করেন—ভাষা দমনের অর্থই সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা। এই গভীর উপলব্ধি থেকেই তাঁর শিল্প, চিন্তা ও সংগ্রাম ধীরে ধীরে মানুষকে সাংস্কৃতিক জাগরণের দিকে এগিয়ে নেওয়ার পথে মোড় নেয়।
১৯২৬ সালের ২১ নভেম্বর চাঁদপুরে পিতার কর্মস্থলে তাঁর জন্ম। তবে শৈশব কাটে কেরানীগঞ্জের রোহিতপুরে—সেখানে তাঁর শিকড়, পরিবার ও প্রাথমিক শিক্ষা। পরে তিনি ভর্তি হন ঢাকা আর্ট কলেজে, যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। তিনি ছিলেন প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন হামিদুর রহমান, খালেদ চৌধুরীর মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা। এই পরিবেশই তাঁকে গড়ে তোলে এক সচেতন, প্রগতিশীল ও সংগ্রামী শিল্পী হিসেবে।
ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনে তিনি শুধু রাস্তায় নামেননি; শহীদ মিনারের নকশায় মূল স্তম্ভের পেছনে লাল সূর্য যুক্ত করার প্রস্তাবও দেন তিনি। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও বাংলার আত্মপরিচয়ের প্রতীক বহন করা এই নকশা তাঁর অন্তর্দৃষ্টি থেকেই সৃষ্টি।
১৯৫২ সালে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে আন্দোলন পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে কেরানীগঞ্জে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং পটুয়া কামরুল হাসানের সঙ্গে ‘চারুশিল্পী সংস্থা’ গঠন—সবই তাঁর সংগ্রামী জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কেরানীগঞ্জের তাঁর বাড়ি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল। বাম রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তাঁর বাড়িতে নিয়মিত গোপন বৈঠকও অনুষ্ঠিত হতো।
বাংলার উৎসব-সংস্কৃতিকে নগর জীবনে পরিচিত ও জনপ্রিয় করতে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ইমদাদ হোসেন। পহেলা বৈশাখ, নবান্ন, বর্ষামঙ্গল ও বসন্তোৎসবকে শহরের সাংস্কৃতিক ধারায় প্রতিষ্ঠা করতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণের কৃতিত্ব তাঁর।
ছাত্রাবস্থাতেই তিনি বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকাসহ নানা কাজে যুক্ত হয়ে আত্মনির্ভর হন। পরবর্তীতে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রের প্রধান ডিজাইনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এর জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে কাজ করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। বিটিভির বর্তমান লোগো ডিজাইন করেন তিনিই।
বন্ধুদের সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুক্তধারা’ নামক প্রকাশনা সংস্থা, যা সাহিত্য–সংস্কৃতির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইমদাদ হোসেন ছিলেন শিল্পী, ডিজাইনার, ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সমাজচিন্তক—সব পরিচয়ের সমন্বয়ে গঠিত এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন নিঃশব্দ অথচ নিরলস সংগ্রামের প্রতীক—বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের উজ্জ্বল উদাহরণ।
১৩ নভেম্বর ২০১১ সালে তিনি পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন। তবে তাঁর শিল্প, তাঁর ধারণা ও তাঁর সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা আজও অনুপ্রেরণা জোগায়।
চিত্রশিল্পী ইমদাদ হোসেন—বাংলার সাংস্কৃতিক জাগরণের আলোকশিখা হয়ে তিনি চিরকাল স্মরণীয় থাকবেন।
খবরওয়ালা /এসএস