খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমন এবং সম্ভাব্য যুদ্ধাবস্থা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে এই কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান আশা প্রকাশ করেছে যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের এই নতুন ও পরিমার্জিত প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতে পারে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবটি উভয় দেশের মধ্যকার বৈরী সম্পর্ক নিরসনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে ইরান যে শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, সেটির ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সন্তোষ প্রকাশ করেননি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছিল, ট্রাম্প আগের প্রস্তাবটি গ্রহণ করবেন না বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্পের মতে, ইরানের পূর্ববর্তী প্রস্তাবে সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ছিল। মূলত এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পরই ইরান তাদের প্রস্তাবনা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমান কূটনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। সূত্র অনুযায়ী, রাশিয়া সফর শেষ করে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) তেহরানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তাঁর। তেহরানে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি ইরান সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে পরামর্শ করবেন এবং ট্রাম্পের আপত্তির বিষয়গুলো বিবেচনা করে সংশোধিত প্রস্তাবের রূপরেখা চূড়ান্ত করবেন।
ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কিছুটা জটিলতা দেখা দেওয়ায় প্রস্তাব পাঠানোর বিষয়টি ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ইরানের সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনির সঙ্গে সরকারের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ বর্তমানে অত্যন্ত সীমিত। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান টালমাটাল পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরানের হাতে সময় খুবই সীমিত।
ইরান এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, তাতে প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে—আলোচনা শুরুর আগে অবশ্যই যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা বন্ধ করতে হবে। ইরান দাবি করেছে যে, সামরিক সংঘাত বন্ধ হওয়ার পর তারা পারমাণবিক কার্যক্রম এবং অন্যান্য অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে টেবিলে বসতে রাজি। তবে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা দাবি করছে যে, বিরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা বন্ধ এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে ইরানকে আগে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ইরান সম্পর্কে একাধিক চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। মঙ্গলবার এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান বর্তমানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ‘ধসে পড়েছে’ বা ‘বিধ্বস্ত’ অবস্থায় আছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সঠিক অবস্থান বা প্রধান নেতা কে, সেটি খোদ ইরানের নেতৃবৃন্দই নিশ্চিতভাবে জানেন না।
ট্রাম্পের বর্ণনামতে, ইরান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে তারা চরম সংকটে রয়েছে এবং তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র যেন দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ খুলে দেয়। ট্রাম্প লিখেছেন:
“ইরান এইমাত্র আমাদের অবহিত করেছে যে তারা বিধ্বস্ত অবস্থায় আছে। তারা চায় যত দ্রুত সম্ভব আমরা যেন হরমুজ প্রণালি খুলি। ইরানিরা এখন তাদের নেতৃত্বের অবস্থা খুঁজছে। আমি আশা করি এতে তারা সফল হবে।”
উল্লেখ্য যে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্ট। এই প্রণালি বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরান এখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে এই পথ উন্মুক্ত করার জন্য ওয়াশিংটনের সহায়তা চাইছে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ‘অত্যন্ত নাজুক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরানের পরবর্তী সংশোধিত প্রস্তাবের বিষয়বস্তুর ওপরই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র তা গ্রহণ করবে কি না। যদি ইরান ওয়াশিংটনের মূল উদ্বেগের জায়গাগুলো যেমন—পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা বন্ধের বিষয়ে কোনো নমনীয় শর্ত যুক্ত করে, তবেই আলোচনার পথ প্রশস্ত হতে পারে। অন্যথায়, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা এই সংকটকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানের সংশোধিত প্রস্তাবটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এখন গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয়। পাকিস্তানসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো আশা করছে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রস্তাবের মাধ্যমে তেহরান ও ওয়াশিংটন পুনরায় আলোচনা শুরু করতে সক্ষম হবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।