খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 24শে আশ্বিন ১৪৩২ | ৯ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য জার্মানিকে গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আরিফুল হক। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রির আবেদনের জন্য সাক্ষাৎকারের দিন ধার্য করেন। এরপর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে যায়। ২০২৫ সালের মে মাসে দূতাবাস থেকে তিনি সাড়া পান। পরবর্তীতে ভিসা সহায়তাকারী সংস্থা ভিএফএস (ভিসা ফ্যাসিলেশন সার্ভিসেস) গ্লোবালে তিনি প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেন। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় প্রায় আড়াই বছর সময় লাগে। তিনি পরামর্শ দেন, ‘‘যারা জার্মানিতে পড়তে যেতে চান, তারা যেন একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ভর্তির অনুমতিপত্র সংগ্রহ করে রাখেন। কারণ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনা খরচে আবেদনের সুযোগ রয়েছে।’’
কেবল জার্মানি নয়, ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ইউরোপের বহু দেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসছে। তবে শুধু জার্মানিতে ভিসার আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগছে। জার্মান দূতাবাসের তথ্যমতে, তারা বছরে মাত্র ২ হাজার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করতে সক্ষম। অথচ এর বিপরীতে জার্মান দূতাবাসে প্রায় ৪০ গুণ বেশি আবেদন জমা পড়ে। এই কারণেই এমন ধীরগতি।
বিগত বছরের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভিএসি) অনির্দিষ্টকালের জন্য ভিসা কার্যক্রম সীমিত করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে আবেদন করতে শিক্ষার্থীদের দিল্লি গমন করতে হয়। এই কারণে ভারতের দ্বৈত প্রবেশ (ডাবল এন্ট্রি) ভিসার প্রয়োজন হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থীই সমস্যায় পড়ছেন। বাংলাদেশে পর্তুগাল, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, লিথুয়ানিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের একাধিক দেশের দূতাবাস স্থাপিত হয়নি। ফলস্বরূপ, এসব দেশে পড়তে যেতে হলে শিক্ষার্থীদের নিকটবর্তী রাষ্ট্র ভারতে গিয়ে ভিসা সাক্ষাৎকার দিতে হয়।
দিল্লির বিকল্প হিসেবে ইন্দোনেশিয়া এবং ভিয়েতনামের দূতাবাস থেকে কয়েকটি দেশের ভিসার জন্য আবেদনের ব্যবস্থা করা হলেও, এই দুটি দেশের ভিসাও বর্তমানে বাংলাদেশিদের জন্য সীমিত হয়ে পড়েছে।
জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার আশা পরিত্যাগ করেছেন আবির। তিনি জানান, দূতাবাস যেভাবেই ভিসা প্রক্রিয়া করুক না কেন, তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি না করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। পূর্ববর্তী আবেদনগুলি প্রক্রিয়া করতে করতে কয়েক বছর চলে যাবে, যার ফলে জার্মানিতে গমনের আগ্রহ নষ্ট হয়ে যাবে।
অন্য এক শিক্ষার্থী জানান, স্টুডেন্ট ভিসার জন্য জার্মান দূতাবাসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার পর ৫০০ দিনেরও অধিক সময় অতিবাহিত হয়েছে। এত দীর্ঘ সময় পরও দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। তিনি অনুরোধ করেন— যারা ভুয়া অফার লেটার দিয়ে আবেদন করেন, তারা যদি এই কাজ থেকে বিরত থাকেন, তাহলে অনেকের জন্য সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এই বিষয়ে জানতে ঢাকার জার্মান দূতাবাসে ই-মেইল করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে দূতাবাসের ফেসবুক পাতায় মাঝে মাঝে ভিসা সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর জার্মান দূতাবাস জানায়, ‘‘যেহেতু ভিসা বিভাগ বর্তমানে অতিরিক্ত অনুরোধের সম্মুখীন হচ্ছে—তাই আমরা আবেদনকারীদের ই-মেইল জিজ্ঞাসা পাঠানো থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করছি, যা ইতোমধ্যে আমাদের ওয়েবসাইটে পরামর্শ করে উত্তর দেওয়া সম্ভব। এটি আমাদের আরও কার্যকরভাবে কাজগুলো প্রক্রিয়া করতে সহায়তা করবে এবং নিশ্চিত করবে যে আমরা আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আমাদের সীমিত ক্ষমতা ব্যয় করতে পারি। অনুগ্রহ করে মনে রাখবেন যে এই ধরনের অনুসন্ধানের উত্তর দেওয়া হবে না।’’
এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর জার্মান দূতাবাস জানায়, আবেদনকারীদের বিশেষ অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য যোগাযোগ করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে। ন্যায্যতার স্বার্থে, দূতাবাস কঠোরভাবে অপেক্ষমাণ তালিকা অনুসরণ করে এবং কোনো ব্যতিক্রম করতে পারে না।’’
বাংলাদেশে পূর্ব ইউরোপের কোনো দেশের দূতাবাস নেই। সেসব দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লিতে অবস্থিত তাদের দূতাবাসে শিক্ষার্থীদের আবেদন জমা দিতে হয়। এই দেশগুলিতে ভিসার আবেদনের জন্য আবেদনকারীকে বেশ কিছুদিন দিল্লিতে অবস্থান করতে হয়। এতে অতিরিক্ত ব্যয়ভার যুক্ত হয়। শিক্ষার্থীদের মতে, এসব দেশের ভিসা আবেদনের জন্য কমপক্ষে ২০ দিন দিল্লিতে থাকতে হয়।
মধ্য ইউরোপের দেশ স্লোভেনিয়ার ভিসা অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে দেশটিতে আবেদনকারী এক শিক্ষার্থী জানান, কমপক্ষে তিনবার ভারতে যাওয়া অপরিহার্য, এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। দ্বিতীয়বার দূতাবাস লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে।
ভিসা জটিলতা নিয়ে ঢাকায় ইউরোপগামী একদল শিক্ষার্থী গত বছর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। তারা জানান, ‘‘গত বছরগুলির মতো এবারও হাজারো শিক্ষার্থী ইউরোপে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য যেতে আগ্রহী। এ কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পাওয়ার পর টিউশন ফি পরিশোধ করে— সর্বশেষ যে ধাপটির মোকাবিলা করতে হয়, তা হলো ভিসা সাক্ষাৎকার।
তাদের মতে, বিগত সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতার মধ্যে অন্যতম একটি ব্যর্থতা হলো— ইউরোপ মহাদেশের অধিকাংশ দেশের দূতাবাস বাংলাদেশে আনতে না পারা। ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভারতে গিয়ে ভিসা সাক্ষাৎকারের মুখোমুখি হতে হয়। ভারতে ভিসা সাক্ষাৎকারের জন্য প্রবেশ করতে হলে তাদের দেশের নিয়মানুযায়ী দ্বৈত প্রবেশ ভিসা নিতে হয়। কিন্তু তাদের শর্তানুযায়ী সকল বৈধ প্রমাণপত্র দেওয়ার পরও ভারত অকারণে দ্বৈত প্রবেশ ভিসা বাতিল করে দেয়। এতে যেমন শিক্ষার্থীদের সময় নষ্ট হয়, তেমনই আর্থিকভাবেও তারা ক্ষতির সম্মুখীন হন।
শিক্ষার্থীরা আরও জানান, বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী বৃত্তি পাওয়ার পরও এই দ্বৈত প্রবেশ ভিসা জটিলতার কারণে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না। একই সাথে যারা নিজস্ব অর্থায়নে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে টিউশন ফি পরিশোধ করেন, তারা নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলে অনেক ক্ষেত্রে সেই টিউশন ফি-ও ফেরত পান না।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ‘‘জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা উন্নত মানের এবং এটি বিনামূল্যে। এই কারণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জার্মানিতে যেতে প্রবল আগ্রহী। জার্মান দূতাবাসে ৮০ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। জার্মানির রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি চলে গেছেন। তিনি বলে গেছেন, আসলে তার কোনো কিছুই করার নেই। তাদের সক্ষমতা হচ্ছে প্রতিবছর ২ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করা। এর মানে হলো— তারা এই পরিমাণ আবেদন সামলাতে পারবেন না।
উপদেষ্টা বলেন, ‘‘আমরা জার্মানিকে অনুরোধ করেছি, পাকিস্তান থেকে তারা প্রতি বছর ৯ হাজার শিক্ষার্থী গ্রহণ করে। বাংলাদেশ থেকেও যেন সেই সংখ্যক শিক্ষার্থী নেয়। আমরা চেষ্টা করছি, এটা সম্ভব কিনা।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘উচ্চশিক্ষা এবং কাজের জন্য দূতাবাসে উপস্থিত হয়ে ভিসা নিতে হয়। এটি নিয়েও আমরা অনেক সমস্যায় আছি। কারণ, আমাদের এখানে অনেক দেশের রাষ্ট্রদূত নেই। তাদের অফিস দিল্লিতে। অসুবিধা হলো, ভারতের ভিসা পাওয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। এটা নিয়ে আমরা অনেক ভুগছি। আমরা চেষ্টা করছি এই প্রক্রিয়াকে বৈচিত্র্যময় করা যায় কিনা।’’
খবরওয়ালা/টিএসএন