মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি প্রায় দুই হাজার ছেচল্লিশ কোটি টাকার ডিজেল ও অকটেন আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকার সৌদি রাজপরিবারের মালিকানাধীন দুবাইভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পেট্রোগ্যাস থেকে এ তেল সংগ্রহ করতে চায়।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন দেশের জ্বালানি তেলের প্রধান আমদানিকারক সংস্থা। প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত আমদানির ক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করে। মোট আমদানির প্রায় অর্ধেক সরকার থেকে সরকার পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা হয় এবং বাকি অংশ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনা হয়। সরকার থেকে সরকার চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করা হয়। এসব তেল পরে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। গত আটাশ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর ইরান এক মার্চ থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহন হয়ে থাকে। ফলে বিশ্ববাজারে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দামেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মার্চ ও এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে জটিলতা দেখা দিয়েছে। মার্চ মাসে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য সতেরোটি ঋণপত্র খোলা হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র চারটি জাহাজে তেল দেশে পৌঁছেছে এবং ছয়টি জাহাজ পথে রয়েছে। বাকি সাতটি চালানের বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে এপ্রিল মাসের জন্য পনেরোটি ঋণপত্র খোলা হলেও এর মধ্যে তেরোটি চালানের প্রাথমিক সম্মতি মিলেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি মজুত স্থিতিশীল রাখতে বিদ্যমান চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত তেল আমদানির উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ছয় মার্চ পেট্রোগ্যাস নামের দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য পরিচিত।
সরকারি ক্রয় আইন অনুযায়ী জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পণ্য সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। সেই বিধান অনুসারে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে মূল্য প্রস্তাব আহ্বান করা হলে তারা নয় মার্চ আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দেয়। প্রস্তাব অনুযায়ী পণ্য লোডিংয়ের দিনে ঘোষিত আরব উপসাগর সূচক মূল্যের সঙ্গে প্রতি ব্যারেলে তিন ডলার অতিরিক্ত মূল্য যোগ করে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন একটি কমিটি গঠন করে। তারা পরীক্ষায় দেখতে পায় যে সরবরাহকৃত পণ্যের মান দেশের নির্ধারিত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে দেশে আমদানিকৃত ডিজেলে সালফারের মাত্রা পঞ্চাশ অংশ প্রতি মিলিয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী এক লাখ টন ডিজেল এবং পঁচিশ হাজার টন অকটেন আমদানি করা হবে। এর সম্ভাব্য ব্যয় হিসাব করে একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি করা হয়েছে।
| জ্বালানি তেলের ধরন | পরিমাণ | সম্ভাব্য ব্যয় (ডলার) | সম্ভাব্য ব্যয় (টাকা) |
|---|---|---|---|
| ডিজেল | এক লাখ টন | প্রায় তেরো কোটি আটান্ন লাখ | প্রায় এক হাজার ছয়শ ছেষট্টি কোটি |
| অকটেন | পঁচিশ হাজার টন | প্রায় তিন কোটি দশ লাখ | প্রায় তিনশ আশি কোটি |
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অতীতে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ডিজেল আমদানিতে প্রতি ব্যারেলে প্রায় চার ডলার বাহাত্তর সেন্ট থেকে চার ডলার আটাত্তর সেন্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়েছে। আবার সরকার থেকে সরকার আলোচনার মাধ্যমে সর্বনিম্ন পাঁচ ডলার তেত্রিশ সেন্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। অকটেনের ক্ষেত্রে এ অতিরিক্ত মূল্য প্রায় ছয় ডলার আশি সেন্ট পর্যন্ত ছিল।
সে তুলনায় বর্তমান প্রস্তাবে প্রতি ব্যারেলে তিন ডলার অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণকে তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালনা পর্ষদ এগারো মার্চ অনুষ্ঠিত সভায় এ ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।