খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন কেবল বারুদের গন্ধেই ভারী নয়, বরং আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করছে বিশ্বের জ্বালানি ভাণ্ডারকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে ইরান এখন তার রণকৌশল পরিবর্তন করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তেহরানের এই ‘জ্বালানি যুদ্ধ’ বা ‘এনার্জি ওয়ার’ কৌশল ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের কম্পন সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও গ্যাস শোধনাগারগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের মতো অত্যন্ত শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নেই। এই সুযোগটিকেই কাজে লাগাচ্ছে ইরান। গত সোমবার ইরানের ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর সৌদি আরব তাদের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার ‘রাস তানুরা’ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে কাতারেও; বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস স্থাপনায় হামলার পর উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
নিচে সাম্প্রতিক হামলার শিকার হওয়া প্রধান জ্বালানি স্থাপনা ও সেগুলোর প্রভাবের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:
| স্থাপনার নাম ও দেশ | প্রভাব/ক্ষয়ক্ষতির ধরন | উৎপাদন সক্ষমতা/গুরুত্ব |
| রাস তানুরা রিফাইনারি (সৌদি আরব) | ড্রোন হামলার পর উৎপাদন বন্ধ | দৈনিক ৫.৫ লাখ ব্যারেল তেল |
| কাতারএনার্জি এলএনজি প্ল্যান্ট | ড্রোন হামলার পর উৎপাদন স্থগিত | বিশ্বের ২০% এলএনজি সরবরাহকারী |
| আহমাদি শোধনাগার (কুয়েত) | ড্রোনের ধ্বংসাবশেষে ২ কর্মী আহত | কুয়েতের প্রধান পরিশোধনাগার |
| ইরাকি কুর্দিস্তান ও ইসরায়েলি গ্যাসক্ষেত্র | নিরাপত্তার খাতিরে উৎপাদন বন্ধ | আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত |
| হরমুজ প্রণালি (সমুদ্রপথ) | জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ | বিশ্বের ১০% তেল পরিবহনের পথ |
যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে অপরিশোধিত তেলের দাম ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৮২ ডলারে উন্নীত হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সংঘাত যদি আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। নরওয়েভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিস্টাড এনার্জি’র মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা মানে প্রতিদিন এক কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান খুব সচেতনভাবেই জ্বালানি খাতকে নিশানা করছে। এর পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে:
১. মার্কিন জনমতের ওপর চাপ: জ্বালানির দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি করবে।
২. সহজ লক্ষ্যবস্তু: সৌদি আরব, কাতার বা কুয়েতের জ্বালানি অবকাঠামোগুলো ভৌগোলিকভাবে ইরানের খুব কাছে এবং এগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল।
৩. অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল: বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ বিরতিতে বাধ্য করা তেহরানের অন্যতম লক্ষ্য।
লন্ডনের কিংস কলেজের প্রভাষক রব গেইস্ট পিনফোল্ডের মতে, এই যুদ্ধ কেবল তেলের দামই বাড়াবে না, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোতে খাদ্য সংকটও তৈরি করবে। দুবাই, দোহা বা কুয়েতের মতো শহরগুলো তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের বড় অংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করে। সমুদ্রপথ বন্ধ থাকায় এই দেশগুলোতে অচিরেই ফলমূল, সবজি ও মৌলিক পণ্যের আকাল দেখা দিতে পারে।
এদিকে, উপসাগরীয় মিত্রদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সৌদি কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেছেন যে, আমেরিকা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেবল ইসরায়েলকে রক্ষা করার জন্য সরিয়ে নিয়েছে, আর মিত্র দেশগুলোকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে অরক্ষিত অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে। এই কূটনৈতিক ফাটল মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে।