খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল ২০২৫
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তার প্রিয় খেলায়—শুল্ক আরোপ! এবার এক ঝটকায় তিনি একগুচ্ছ দেশের পণ্যের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক। তার প্রশাসনের চোখে শুল্ক যেন জাদুর দণ্ড—যা নেড়ে দিলেই বদলে যাবে বাণিজ্য সমীকরণ। গত ২ এপ্রিল ঘোষণার পর ৩ এপ্রিল কার্যকর হয় এই নতুন শুল্কের ঢল। মুহূর্তেই যেন কাঁপতে শুরু করে বিশ্ববাজার। শেয়ারবাজারে দেখা দেয় ধস, ধনকুবেরদের সম্পদ গলতে থাকে বরফের মতো, আর নানান দেশ থেকে শোনা যায় ক্ষোভের গুঞ্জন। চীনসহ কিছু দেশ তো পাল্টা ঘুঁষিও মেরেছে—তরবারির জবাব তরবারিতেই!
এই রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে সেই ১০টি দেশ ও অঞ্চল, যারা ট্রাম্পের শুল্ক-ঝড়ের সবচেয়ে বড় শিকার। কারো ওপর গেছে রেকর্ড ৫০ শতাংশ, কারো ব্যবসা এখন ধুঁকছে অনিশ্চয়তার আঁধারে। কে কেমন বিপাকে পড়ল, তাই নিয়েই আজকের এ বিশেষ আয়োজন।
১. লেসেথো (৫০ শতাংশ)
ট্রাম্পের সর্বশেষ শুল্ক ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে আফ্রিকার দেশ লেসেথো এবং কানাডা উপকূলে অবস্থিত ফরাসি অঞ্চল সেন্ট পিয়েরে ও মিকেলেনের ওপর। ঘোষণার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘এমন একটা জায়গা, কেউ হয়তো নামও শোনেনি।’ অথচ সেই লেসেথোর ওপরই তিনি রেকর্ড ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছেন। এতে দেশটির রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি আরও সংকটে পড়বে। লেসেথো মূলত যুক্তরাষ্ট্রে টেক্সটাইলজাত পণ্য, যেমন ডেনিম জিনস, রপ্তানি করে। মাত্র ছয় হাজার লোকের ছোট দ্বীপ সেন্ট পিয়েরে ও মিকেলেনের ওপরও ট্রাম্প ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এখান থেকে তেমন পণ্য রপ্তানি না হওয়ায় সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
২. কম্বোডিয়া (৪৯ শতাংশ)
ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ঘোষণার ফলে বিপাকে পড়েছেন কম্বোডিয়ার পোশাক শিল্পের শ্রমিকেরা। দেশটির ওপর ৪৯ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এতে করে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন ইউনিট অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে। দেশটির বেশিরভাগ পোশাক কারখানার মালিক চীনা নাগরিক।
শুল্ক আরোপের এক দিন পর কম্বোডিয়া সরকার ট্রাম্পকে খুশি করতে ১৯টি পণ্যের শুল্ক ৩৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত ট্রাম্পকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছেন যেন কম্বোডিয়ার ওপর শুল্ক স্থগিত করা হয়।
৩. লাওস (৪৮ শতাংশ)
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্র লাওসের ওপর ৪৮ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছেন ট্রাম্প। স্নায়ুযুদ্ধের সময় দেশটির ওপর ব্যাপকভাবে বোমাবর্ষণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এডিবির তথ্যমতে, দেশটির ১৮ শতাংশ জনগণ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। লাওস যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে।
৪. মাদাগাসকার (৪৭ শতাংশ)
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্র মাদাগাসকারের ওপর ৪৭ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এতে দেশটির রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র মাদাগাসকারের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য। দেশটির সরকার কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক উপায়ে এই শুল্ক পর্যালোচনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
৫. ভিয়েতনাম (৪৬ শতাংশ)
যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী দেশ ভিয়েতনামের ওপর ৪৬ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই শুল্কে দেশটির রপ্তানি খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। তবে বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে ভিয়েতনাম সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৬. মিয়ানমার (৪৫ শতাংশ)
কিছুদিন আগেই শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত হয়েছে মিয়ানমার। চলমান সামরিক দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে থাকা এই দেশটির ওপর ৪৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছে ট্রাম্প। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুল্ক ইস্যুতে আলোচনা করা হতে পারে, তবে আপাতত ত্রাণ তৎপরতায় বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।
৭. শ্রীলঙ্কা (৪৪ শতাংশ)
শ্রীলঙ্কার তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়। গত বছর দেশটি এই খাত থেকে ১৯০ কোটি ডলার আয় করেছে। শুল্কারোপের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে সরকার ও শিল্প প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা প্যানেল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।
৮. ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (৪২ শতাংশ)
ব্রিটিশ প্রশাসনের আওতায় থাকা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যার নিজস্ব সরকার রয়েছে, তাদের ওপর ৪২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। এখানকার অর্থনীতি মূলত মাছধরার ওপর নির্ভরশীল। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ২ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানি করেছে দ্বীপটি।
৯. সিরিয়া (৪১ শতাংশ)
মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শুল্ক বসানো হয়েছে সিরিয়ার ওপর—৪১ শতাংশ। যদিও দুই দেশের মধ্যে কার্যকর বাণিজ্য সম্পর্ক নেই। নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই দেশের ব্যাংক লেনদেনও বন্ধ রয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া থেকে ১ কোটি ১০ লাখ ডলারের কৃষিপণ্য ও প্রাচীন সামগ্রী আমদানি করেছে।
১০. মরিশাস (৪০ শতাংশ)
আফ্রিকার দেশ মরিশাসের ওপর ৪০ শতাংশ হারে শুল্ক বসিয়েছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প এটিকে ‘পারস্পরিক ও সর্বজনীন’ শুল্কারোপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কারণ, মরিশাস যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ৮০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে থাকে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, বিবিসি
খবরওয়ালা/আরডি