খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 2শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ১৫ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে লন্ডনের অবস্থানের প্রতি অসন্তোষ থেকেই এমন কঠোর মন্তব্য এসেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে। এতে দুই ঐতিহ্যবাহী মিত্র দেশের সম্পর্ক নতুন করে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনার মুখে পড়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী রেচেল রিভসের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, কোনো সুস্পষ্ট “এক্সিট প্ল্যান” ছাড়া সামরিক সংঘাতে জড়ানো একটি গুরুতর ভুল সিদ্ধান্ত। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। রিভস এই নীতিকে “বেপরোয়া সিদ্ধান্ত” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
এর পরপরই ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয় এবং বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনার হুঁশিয়ারি আসে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য মূলত লন্ডনের সামরিক ও কূটনৈতিক নিরপেক্ষ অবস্থানের প্রতি ওয়াশিংটনের অসন্তোষের প্রকাশ।
২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাজ্য প্রথম দেশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছায়। এটি দুই দেশের ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ইরান ইস্যুকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মতবিরোধ সেই চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিলেও যুক্তরাজ্য সরাসরি সংঘাতে জড়ায়নি। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বারবার বলেছেন, “এটি আমাদের যুদ্ধ নয়।” এই অবস্থানের ফলে ওয়াশিংটন অসন্তুষ্ট হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
লন্ডন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণ সামরিক সহায়তা দিতে দ্বিধা করে। বিশেষ করে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে তারা সতর্ক অবস্থান নেয়। স্টারমার সংসদে স্পষ্ট করেন, যুক্তরাজ্য এই সংঘাতে সরাসরি অংশ নেবে না এবং কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনাগ্রহের ইঙ্গিত, বিশেষ করে যখন ওয়াশিংটন সমর্থন প্রত্যাশা করেছিল।
| বিষয় | যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান | যুক্তরাজ্যের অবস্থান |
|---|---|---|
| ইরান যুদ্ধ | সামরিক পদক্ষেপে সক্রিয় অংশগ্রহণ | সরাসরি অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি |
| হরমুজ প্রণালী | নৌ সহায়তা প্রত্যাশা | যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে অনীহা |
| সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার | দ্রুত অনুমতি প্রত্যাশা | অনুমতি প্রদানে বিলম্ব |
| রাজনৈতিক অবস্থান | কঠোর সমর্থন প্রত্যাশা | “এটি আমাদের যুদ্ধ নয়” নীতি |
ট্রাম্প অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন সহায়তা চেয়েছিল, তখন যুক্তরাজ্য প্রত্যাশিত সমর্থন দেয়নি। তিনি আরও বলেন, ব্রিটেনের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি অত্যন্ত উদারভাবে করা হয়েছে, যা প্রয়োজন হলে পরিবর্তন করা যেতে পারে।
তিনি যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ নীতির সমালোচনাও করেন। তাঁর মতে, ব্রিটেনের অভিবাসন নীতি বিশৃঙ্খল এবং উত্তর সাগরের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর। তাঁর দাবি, এসব নীতির কারণে জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারা ট্রাম্পের মন্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। কেউ কেউ এটিকে “কূটনৈতিক সতর্কবার্তা” হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে “দীর্ঘস্থায়ী ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব” হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, কোনো একক রাজনৈতিক বক্তব্য এই সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে না।
ট্রেজারি কর্মকর্তারা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার হলেও ইউরোপসহ অন্যান্য বাজারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় একক বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এই বিশাল অর্থনৈতিক নির্ভরতার কারণে কোনো ধরনের বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের হুমকি দুই দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক মতবিরোধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা শুধু বাণিজ্য নয়, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে ইরান ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা এখন সরাসরি বাণিজ্য চুক্তির স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই সম্পর্ককে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।