খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই আগস্ট ২০২৬, ৭:১৭ পিএম
ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করতে রাজধানীর আরও ৫০টি স্থানে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেতবাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এসব স্থানে সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপনে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি স্থানে গড়ে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
তবে এই অর্থের পুরোটা শুধু সংকেতবাতি কেনা বা বসানোর জন্য নয়। এর মধ্যে রয়েছে সিগন্যালের খুঁটি ও ভিত্তি নির্মাণ, স্টিলের বেড়া, বিদ্যুৎ সংযোগ, ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ, সড়ক খনন, ক্যামেরা, নিয়ন্ত্রণ বক্স, ট্যাব এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম। সিগন্যাল ব্যবস্থার নকশা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি যানবাহনের চলাচল নিয়ে জরিপও করা হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় ২৮টি স্থানে এ ব্যবস্থা চালু করতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২২টি স্থানের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। দুই সিটি মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৯৯ কোটি টাকা। এই হিসাবের মধ্যে ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ধরা হয়নি।
নতুন সিগন্যাল ব্যবস্থার কাজ মূলত দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। সিটি করপোরেশনের নিয়োজিত ঠিকাদাররা অবকাঠামোগত বা পূর্তকাজ করবেন। আর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রযুক্তিগত অংশের দায়িত্ব পালন করবে।
ঠিকাদারদের কাজের মধ্যে থাকবে সিগন্যালের দুই পাশে নির্দিষ্ট অংশে স্টিলের বেড়া নির্মাণ, ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ তৈরি, সংকেতবাতির খুঁটি ও ভিত্তি নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সড়ক খনন বা কাটার কাজ।
অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় সিগন্যাল ব্যবস্থার নকশা তৈরি করবে এবং সংকেতবাতি, নিয়ন্ত্রণ বক্স, ট্যাব, ক্যামেরাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। পাশাপাশি যানবাহনের প্রবাহ ও চলাচল সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ ও জরিপ চালানো হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮টি স্থানে পূর্তকাজে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। এর মধ্যে স্টিলের বেড়া নির্মাণে প্রায় ৮ কোটি ৩৬ লাখ, সংকেতবাতির খুঁটি নির্মাণে প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ, খুঁটির ভিত্তিতে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ এবং বিদ্যুতায়নে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ বক্স, সড়ক খনন, ট্রাফিক সাইনসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় হবে প্রায় ১৬ কোটি টাকা। প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও পরামর্শ বাবদ আরও প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২২টি স্থানে পূর্তকাজে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা এবং প্রযুক্তিগত কাজ ও সরঞ্জামের জন্য প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে সেখানে ব্যয় হবে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা।
এর আগে রাজধানীর ২২টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নতুন ধরনের ট্রাফিক সংকেতবাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এসব সিগন্যাল ব্যবস্থায় প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল। পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ব্যবস্থা চালু করা হয়।
পরবর্তীতে এসব সিগন্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, স্বয়ংক্রিয় সংকেত চালুর ফলে নির্দিষ্ট কিছু মোড়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে আগের তুলনায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর অন্যতম লক্ষ্য হলো চালকদের নিজস্ব ইচ্ছায় গাড়ি থামানো বা এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমানো। সংকেতের আলো অনুযায়ী গাড়ি চলাচল করলে একই সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে আসা যানবাহনের সংঘাতের ঝুঁকিও কমতে পারে। পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশকে প্রতিটি মোড়ে হাতের সংকেত দিয়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের ওপর কম নির্ভর করতে হবে।
তবে শুধু স্বয়ংক্রিয় সংকেত স্থাপন করলেই রাজধানীর যানজটের স্থায়ী সমাধান হবে না। অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, সড়কে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং সংকেত অমান্যের মতো বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। বিশেষ করে একটি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কার্যকর হলেও আশপাশের সড়কে একই ধরনের শৃঙ্খলা না থাকলে যানজট অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট দুই সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দ্রুত সিগন্যাল স্থাপনের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ৫০টি সিগন্যাল চালু হলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত হবে। তবে এই প্রকল্পের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে সিগন্যালগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ট্রাফিক আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের ওপর।
মন্তব্য