বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ ভারত সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতের মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানি উৎস বহুমুখীকরণের কৌশল গ্রহণ করেছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশটি সাধারণত তার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেক সংগ্রহ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যা মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক রুট। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপ এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ রুট দিয়ে তেল পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে, যার মধ্যে ভারতও রয়েছে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মতো উচ্চ আমদানিনির্ভর অর্থনীতি এবং তুলনামূলক সীমিত মজুদ ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামায় দেশটি দ্রুত ঝুঁকিতে পড়ে। যদিও এখনো প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের মতো তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়নি, তবে রান্নার গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে চাপ লক্ষ করা যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত তার দীর্ঘদিনের জ্বালানি অংশীদারদের দিকে পুনরায় ঝুঁকেছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এবং ফ্রান্স টোয়েন্টিফোরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ভারত দৈনিক গড়ে প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করেছে, যা আগের দুই মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
জ্বালানি পরিবহন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ক্যাপলারের বিশ্লেষক নিকিল দুবের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সাময়িক ছাড়ের ফলে রুশ তেলের আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ছাড়ের ফলে সমুদ্রপথে থাকা রুশ তেলের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল হয়, যা ভারতকে অতিরিক্ত সরবরাহ গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনাও দেখা গেছে, বিশেষ করে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে।
রাশিয়ার পাশাপাশি আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দিকেও নজর বাড়িয়েছে ভারত। অ্যাঙ্গোলা থেকে মার্চ মাসে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করা হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। একই সময়ে নাইজেরিয়া থেকেও সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ইরান ও ভেনেজুয়েলা থেকেও পুনরায় তেল আমদানি শুরু হয়েছে।
ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রধান উৎস ও পরিবর্তিত চিত্র নিচে উপস্থাপন করা হলো—
| উৎস দেশ/অঞ্চল |
মার্চ মাসে দৈনিক আমদানি (ব্যারেল) |
পরিবর্তনের ধারা |
| রাশিয়া |
১৯,৮০,০০০ |
উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি |
| অ্যাঙ্গোলা |
৩,২৭,০০০ |
প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি |
| নাইজেরিয়া |
নির্দিষ্ট নয় |
বৃদ্ধি পেয়েছে |
| ইরান |
পুনরায় শুরু |
নতুনভাবে যুক্ত |
| ভেনেজুয়েলা |
পুনরায় শুরু |
নতুনভাবে যুক্ত |
তবে এই বহুমুখীকরণ সত্ত্বেও সামগ্রিক আমদানি হ্রাস পেয়েছে। মার্চ মাসে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানি নেমে এসেছে ৪.৫ মিলিয়ন ব্যারেলে, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে তা ছিল ৫.২ মিলিয়ন ব্যারেল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার তেল মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতি পূরণে সক্ষম নয়, কারণ ভারতের বিভিন্ন শোধনাগারের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে ভারতকে প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৫ থেকে ১৫ ডলার বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।
তবুও সরকার এখনো ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানির দাম বাড়ায়নি। বরং কর ও শুল্ক সাময়িকভাবে কমিয়ে চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শেষে দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে লিটারপ্রতি প্রায় ২৮ রুপি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সংস্থাগুলো আর্থিক চাপের মধ্যে থাকলেও সরকার আপাতত দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে ভোক্তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।