খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২৬
ঢাকা: বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগত নতুন একটি আঘাতের মুখে পড়েছে। দেশের প্রাচীন ও খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সম্প্রতি অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। এই ঘটনা দেশের ইসলামী ও বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাকে আবারও সামনে এনেছে। হামলার পেছনে ইসলামী উগ্রপন্থী গোষ্ঠী থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
হামলার সময় ভাঙচুরে পতিত হয়েছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের ছবিসহ অসংখ্য সাংস্কৃতিক চিহ্ন। এই দুই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার আগে প্রতিষ্ঠিত এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় বাঙালি সঙ্গীত ও সংস্কৃতির প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন শহরে ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বর ছাত্র-নেতা শরিফ উসমান হাদি হত্যা ও সাম্প্রতিক হামলার প্রতিবাদে সহিংস বিক্ষোভ দেখা যায়। এই পরিস্থিতিতে দেশীয় মিডিয়া প্রতিষ্ঠান ও সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
হামলার পেছনের সম্ভাব্য দায়ী হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি এবং এর ছাত্র সংগঠন। হামলার আগে, দলের এক নেতা মোস্তাফিজুর রহমান ছায়ানট ও উদীচীকে “নিষ্ট” করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দূর করতে হবে।” যদিও তিনি পরে দাবি করেন, শারীরিক ধ্বংসের কথা বলেননি।
উদীচীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেছেন, “এই হামলা দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি ভাষা ও সংস্কৃতিকে দমন করতে চাওয়া উগ্রপন্থী শক্তির অংশ।” ছায়ানটের সভাপতি ড. সারওয়ার আলী জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানটি বাঙালি পরিচয়কে কেন্দ্র করে কাজ করায় উগ্রপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু।
ছায়ানট ও উদীচীর প্রতিষ্ঠা ও সদস্যসংখ্যা সংক্ষেপে:
| প্রতিষ্ঠান | প্রতিষ্ঠা বছর | সদস্য/শিক্ষার্থী সংখ্যা | উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড |
|---|---|---|---|
| ছায়ানট | ১৯৬১ | ৪,০০০+ শিক্ষার্থী | সঙ্গীত স্কুল, সংস্কৃতি সংরক্ষণ |
| উদীচী | ১৯৬৮ | ১৫,০০০+ সদস্য | বাঙালি নৃত্য, সঙ্গীত ও মুক্তিযুদ্ধের প্রচার |
উগ্রপন্থী হামলার ইতিহাসও দুঃখজনক। উদাহরণস্বরূপ, ২০০১ সালে ছায়ানটের বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হয়। ১৯৯৯ সালে উদীচীর জেসোর অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন মারা যায়। ২০০৫ সালে নেট্রকোনায় উদীচীর অফিসে হামলায় ৮ জন নিহত হন।
উগ্রপন্থীদের হামলার পাশাপাশি, গত নভেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সঙ্গীত শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করার সিদ্ধান্তও তাদের প্রভাবকে নির্দেশ করে। ফায়জ সুবান, ঢাকার গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ডিরেক্টর, বলেন, “সরকারি বাহিনী সম্পূর্ণ কার্যকর না হওয়ায় উগ্রপন্থীরা আরও দৃঢ় হয়েছে। তারা সংখ্যালঘু ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করে ভোটার সমর্থন বাড়াতে চায়।”
অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছায়ানটের হিসাব অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ২৪ মিলিয়ন টাকা। কিন্তু ধ্বংসের বাইরে, শিল্পীদের নিরাপত্তাহীনতা সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
তবুও উদীচী ও ছায়ানট হাল ছাড়েনি। হামলার পরদিন, উদীচীর সদস্যরা তাদের অফিসের বাইরে সঙ্গীত পরিবেশন করে প্রতিরোধের বার্তা দিয়েছেন। অমিত রঞ্জন দে বলেন, “আমাদের আর পিছু হটবার জায়গা নেই, আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।”
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় রক্ষায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিরোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করছে, যেখানে সঙ্গীত ও শিল্প শুধু বিনোদন নয়, বরং জাতীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।