খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
নড়াইল সদর উপজেলার কোড়গ্রামে চলতি বোরো মৌসুমে ধান কাটার সময় মাঠজুড়ে কর্মব্যস্ততা থাকলেও কৃষকদের মুখে উদ্বেগ ও হতাশার ছাপ স্পষ্ট। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিকের উচ্চ মজুরি, সেচ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে ধানের কম দামের কারণে কৃষকদের আর্থিক সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে।
কোড়গ্রামের কৃষক প্রলাদ বিশ্বাস জানান, ধান উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সময়মতো না পাওয়া এবং বাজারে ধানের কম দাম কৃষকদের টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে। বর্তমানে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় এক হাজার নয়শ টাকা, অথচ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বারোশ থেকে তেরোশ টাকায় পৌঁছেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই এলাকার কৃষক শচিন্দ্রনাথ বিশ্বাস চার বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি জানান, ধান কাটার জন্য শ্রমিক নিয়োগে ব্যয় বেড়েছে, পাশাপাশি তাদের তিন বেলা খাবারও দিতে হচ্ছে। জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য ডিজেলের প্রয়োজন হলেও তা সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। তেল সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, এমনকি কখনো সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। এতে চাষাবাদের খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় এ বছর ধান চাষের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর যেখানে প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় বারো হাজার পাঁচশ টাকা ব্যয় হতো, সেখানে এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় আঠারো হাজার টাকায়। অন্যদিকে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় তেরোশ টাকা, যা বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি।
নিচের সারণিতে গত বছর ও চলতি বছরের ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | গত বছর | চলতি বছর |
|---|---|---|
| প্রতি বিঘায় উৎপাদন ব্যয় | ১২,৫০০ টাকা | ১৮,০০০ টাকা |
| শ্রমিকের দৈনিক মজুরি | প্রায় ৯০০-১,০০০ টাকা | ১,২০০-১,৩০০ টাকা |
| প্রতি মণ উৎপাদন ব্যয় | — | ১,৩০০ টাকা |
| প্রতি মণ বিক্রয় মূল্য | — | প্রায় ১,০০০-১,৯০০ টাকা |
ধান কাটার মৌসুমে যান্ত্রিক সহায়তার অভাবও কৃষকদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। সরকার ভর্তুকিতে হারভেস্টার মেশিন সরবরাহ করলেও তা মাঠ পর্যায়ে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এসব মেশিন ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান ক্রয় কার্যক্রম এখনও শুরু না হওয়ায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করছেন। ঋণের চাপ থাকায় অধিকাংশ কৃষকের পক্ষে ধান মজুদ রেখে ভালো দামের জন্য অপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় পাঁচ হাজার দুই শত সাতানব্বই হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে এবং তিন লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার ছয় শত তেইশ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় আট শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর ফলন ভালো হলেও উৎপাদন ব্যয় ও বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকেরা প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। খাদ্য বিভাগ ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু করলে কৃষকেরা ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।