নতুন অর্থবছর শুরু হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশিত নবম পে স্কেলের গেজেট এখনো প্রকাশ হয়নি। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন তৈরি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কোনো সিদ্ধান্তহীনতার কারণে আটকে নেই। বরং আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কারণেই চূড়ান্ত ঘোষণায় কিছুটা সময় লাগছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেলের সুপারিশ বাস্তবায়নের আগে সরকারের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আগের প্রস্তাবিত কাঠামোতে যে পরিমাণ ব্যয় প্রয়োজন হবে, তা বর্তমান রাজস্ব আয়, বাজেট ঘাটতি, ঋণের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টি একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সিদ্ধান্ত হওয়ায় কোনো অংশ দ্রুত বাস্তবায়ন না করে সামগ্রিক প্রভাব বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত সুবিধা এবং অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
সরকারের নীতিগত অবস্থান অনুযায়ী, নবম পে স্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ ধরা হচ্ছে চলতি বছরের ১ জুলাই। অর্থাৎ চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হলে ওই তারিখ থেকেই নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতা সমন্বয়ের বিষয়টি কার্যকর করা হতে পারে। তবে গেজেট প্রকাশের আগে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ও আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে স্কেল একবারে বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে কার্যকর করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই অর্থবছরে সর্বোচ্চ তিন ধাপে এটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে মূল বেতন কার্যকর করা, পরবর্তী অর্থবছরের শুরুতে বাড়িভাড়া সমন্বয় এবং পরে অন্যান্য ভাতা কার্যকরের একটি প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে ভারসাম্য আনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সচিব কমিটির আলোচনায় গ্রেড ১১ থেকে ২০ পর্যন্ত কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি সুবিধা বৃদ্ধির সুপারিশের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে গ্রেড ১ থেকে ১০ পর্যন্ত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম রাখার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা চলছে।
আগের সুপারিশে সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ওই হারে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর জন্য নতুন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।
নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু অর্থ বরাদ্দই নয়, রয়েছে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির বিষয়ও। নতুন বেতন কাঠামো চালু হলে সরকারি হিসাব ব্যবস্থার সফটওয়্যার হালনাগাদ, বেতন নির্ধারণ, পেনশন পুনর্গণনা এবং বিভিন্ন দপ্তরের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। এসব কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতেও সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
গত সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির পঞ্চম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, পে স্কেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বিষয় তাড়াহুড়ো করে চূড়ান্ত না করে নির্ধারিত প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা জানান, নতুন পে স্কেল শুধু সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। তাই প্রতিটি সুপারিশের আর্থিক ব্যয়, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক প্রভাব যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চলতি জুলাই মাসের শেষ নাগাদ সচিব কমিটি তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে পারে। এর আগে আরও কয়েকটি বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সচিব কমিটির সুপারিশ জমা দেওয়ার পর বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় অনুমোদন, আইনগত যাচাই এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হবে। সব ধাপ শেষ হলে নবম পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পথ পরিষ্কার হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে আগ্রহ থাকলেও এখন মূল অপেক্ষা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগলেও এর লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যা একদিকে কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণ করবে, অন্যদিকে দেশের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গেও সামঞ্জস্য বজায় রাখবে।