খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদ বা গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মো. মোস্তাকুর রহমানকে নিয়ে দেশের অর্থবাজারে নানা গুঞ্জন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তিনি স্বনামে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কারণে ঋণখেলাপি হয়েছেন কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। গত শুক্রবার সরকারের পক্ষ থেকে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান নিজেই এই বিষয়ে বিস্তারিত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।
রাজধানী ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ঘোষিত জাতীয় বাজেট-পরবর্তী এই আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও নতুন বাজেটের নানা দিক তুলে ধরতে আয়োজিত এই সভায় সরকারের ১০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং বিশেষ উপদেষ্টার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে গভর্নরও সশরীরে অংশ নেন। সেখানে গণমাধ্যমকর্মীদের পক্ষ থেকে তাঁর অতীতের ঋণ সংক্রান্ত প্রশ্ন করা হলে তিনি নিজের বাণিজ্যিক অবস্থান পরিষ্কার করেন।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাবে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই ধরণের কথা শুনে আসছি।” তিনি নিজের অতীতের ব্যবসা সম্পর্কে তথ্য দিয়ে জানান যে, তাঁর একটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকারী কারখানা ছিল, যা দেশের পরিবেশ রক্ষা করে পরিচালিত হতো। এই কারখানাটি ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে কোনো দিন এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ করা হয়নি। এমনকি বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে উৎপাদিত পণ্য বিদেশের বাজারে রপ্তানি করার প্রক্রিয়া কখনো স্থগিত হয়নি। কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের মাসিক বেতন বা পারিশ্রমিক কখনো বকেয়া বা বাকি পড়েনি এবং ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের কোনো অংশ কখনো মওকুফ বা মকুব করানো হয়নি।
নিজের নেওয়া ঋণের সুনির্দিষ্ট আর্থিক ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আরও কিছু তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান যে, প্রাথমিক পর্যায়ে বার্ষিক ৪ শতাংশ সুদের হারে মোট ১৫০ কোটি টাকার একটি বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের নীতি ও বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে সেই ঋণের সুদের হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ৯ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। এর পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস জনিত অতিমারি এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ নানাবিধ ব্যবসায়িক সমস্যার কারণে ব্যাংকের ঋণের টাকা সময়মতো পরিশোধ করার ক্ষেত্রে কিছুটা বিলম্ব বা সময়ের ব্যবধান তৈরি হয়েছিল। তবে তিনি নিশ্চিত করে বলেন যে, ইতিমধ্যে সেই মোট ঋণের মধ্য থেকে ১০০ কোটি টাকা ব্যাংকে সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ বা শোধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বাকি অংশও নিয়মের মধ্যে রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে নিজের ব্যক্তিগত হিসাব দেওয়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি নাজুক চিত্রও সবার সামনে তুলে ধরেন গভর্নর। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা তিন ভাগের এক ভাগ টাকা বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে চুরি হয়ে গেছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যাংকিং খাতের মূল প্রবাহ থেকে অপসারিত হওয়ার কারণে দেশের বর্তমান ব্যাংকিং খাতকে পুনরায় স্থিতিশীল, সুসংহত এবং নিয়মের মধ্যে ফিরিয়ে আনা বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি অত্যন্ত বড় এবং জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর কর্তৃক পরিবেশিত যাবতীয় সত্য ও যাচাইকৃত তথ্য নিচে টেবিলের মাধ্যমে সংক্ষেপে প্রদর্শন করা হলো:
| নির্দিষ্ট বিষয় ও খাত | প্রকৃত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| বক্তব্য প্রদানকারী ব্যক্তি | মো. মোস্তাকুর রহমান (গভর্নর) |
| সংবাদ সম্মেলনের প্রেক্ষাপট | ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সভা |
| সভার স্থান | ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, ঢাকা |
| উপস্থিত সরকারি প্রতিনিধি | ১০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা |
| ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ধরণ | পরিবেশবান্ধব ও রপ্তানিমুখী কারখানা |
| প্রাথমিক ঋণের পরিমাণ ও সুদ | ১৫০ কোটি টাকা (৪ শতাংশ সুদের হারে) |
| পরবর্তী সময়ে সুদের সর্বোচ্চ হার | ৯ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত |
| ঋণ পরিশোধে বিলম্বের কারণ | করোনাভাইরাস মহামারি ও অন্যান্য বৈশ্বিক সমস্যা |
| ইতিমধ্যেই পরিশোধিত অর্থ | ১০০ কোটি টাকা |
| ব্যাংকিং খাতের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ | মোট আর্থিক ব্যবস্থার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ টাকা চুরি হওয়া |