খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৪৯ পিএম
কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীতে চরম মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় তলিয়ে গেছে নূরিয়া খাতুন নামে সাত বছরের এক শিশু। বুধবার বিকেলে জেলার ভেড়ামারা ও দৌলতপুর সীমানাবর্তী মরিচা ইউনিয়নের ভূরকাপাড়া এলাকায় নদীর পাড় ভাঙনের মুখে পড়ে এই বিপর্যয় ঘটে। ঘটনার সময় তার সাথে থাকা আট বছরের শিশু জামিলা খাতুন কোনো মতে সাঁতরে পাড়ে উঠতে পারলেও, তীব্র স্রোতের তোড়ে নদীতে ভেসে গেছে শিশু নূরিয়া। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত উদ্ধারকারী দলগুলোর আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
নিখোঁজ নূরিয়া খাতুন জুনিয়াদহ গ্রামের বাসিন্দা আশিক শেখের মেয়ে। অন্যদিকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া জামিলা একই এলাকার সন্তান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দৌলতপুরের ভূরকাপাড়া অংশ সংলগ্ন পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছিল। বুধবার বিকেলে শিশু নূরিয়া ও জামিলা নদীর পাড়ে জিও ব্যাগের ওপর বসে খেলাধুলা করছিল। খেলাচ্ছলেই হঠাৎ একটি বিশাল অংশজুড়ে নদীর তীর ভেঙে ধসে পড়ে। মুহূর্তে জিও ব্যাগসহ দুই শিশুই পদ্মার উত্তাল জলে পড়ে যায়। আতঙ্কের মধ্যে জামিলা সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে কোনো রকমে সাঁতরে পাড়ে উঠে নিজের প্রাণ রক্ষা করে। তবে শিশু নূরিয়া পদ্মার আকস্মিক গভীরতা ও পানির টান সামলাতে না পেরে মুহূর্তেই নিখোঁজ হয়ে যায়।
নদী থেকে উঠে এসে জামিলা কান্নাকাটি শুরু করলে আশেপাশের মানুষজনের টনক নড়ে। সে কাঁপতে কাঁপতে উপস্থিত লোকজনকে পুরো ঘটনা জানালে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। গ্রামবাসী কালবিলম্ব না করে নিজেদের উদ্যোগে নদীতে নেমে ও ট্রলার নিয়ে তল্লাশি শুরু করেন। তবে নদীর গভীরতা ও পানির টানের কাছে তাদের প্রাথমিক উদ্যোগ পরাস্ত হয়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পার হয়ে গেলেও নূরিয়ার কোনো হদিস মেলেনি।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দৌলতপুর থানা পুলিশ, ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিস এবং ঈশ্বরদী নৌ-পুলিশের সদস্যরা। নিখোঁজ শিশুটিকে উদ্ধারে তিনটি বাহিনীর সমন্বয়ে একটি যৌথ উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। উদ্ধার কাজে যোগ দিয়েছে ডুবুরি দল। তবে নদীর তলদেশে প্রতিকূল স্রোত ও পানির তীব্র বেগ থাকায় ডুবুরিদের কাজ পরিচালনা করতে মারাত্মক বেগ পেতে হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, দুই শিশু একসঙ্গে নদীতে পড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। একজন পাড়ে উঠতে পারলেও নূরিয়াকে এখনও পাওয়া যায়নি। থানা পুলিশের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশের টিম যৌথভাবে নদীজুড়ে অনুসন্ধান জোরদার করেছে।
ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ শরিফুল ইসলাম পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পদ্মায় পানির অতিরিক্ত গতি ও প্রবল স্রোতের কারণে ধারণা করা হচ্ছে শিশুটি ভেসে বেশ কিছুটা দূরে চলে গিয়ে থাকতে পারে। নদীর গতিপথ হিসাব করে সম্ভাব্য সবকটি পয়েন্টে আমাদের উদ্ধারকাজ নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো হচ্ছে। একটি শিশুর জীবন বাঁচাতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
পদ্মা পাড়ের চলমান ভাঙন ও জিও ব্যাগ ফেলার এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ইতিমধ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী। তাদের মতে, কাজের জায়গায় উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় এমন তাজা একটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এদিকে কনকনে আশঙ্কায় নদীপাড়ে অপেক্ষায় দিন গুনছেন নিখোঁজ নূরিয়ার বাবা-মা ও স্বজনেরা। পুরো ভূরকাপাড়া ও জুনিয়াদহ গ্রামে এখন শুধুই হাহাকার আর কান্নার রোল।
মন্তব্য