খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রাথমিক শিক্ষার মূল্যায়নব্যবস্থায় আবারও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পুনরায় সামষ্টিক মূল্যায়ন বা লিখিত পরীক্ষা চালু করা হচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের ফলে দুই বছর আগে প্রণীত পরীক্ষাবিহীন ধারাবাহিক মূল্যায়নব্যবস্থা আংশিকভাবে পরিবর্তিত হলো। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবক মহলে ইতিমধ্যে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
২০২৩ সালে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের সময় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষা বাতিল করে সম্পূর্ণ ধারাবাহিক মূল্যায়ন চালু করা হয়েছিল। সে সময় যুক্তি ছিল—ছোট শিশুদের ওপর পরীক্ষার মানসিক চাপ কমিয়ে খেলাধুলা ও কার্যক্রমভিত্তিক শিখন নিশ্চিত করা। তবে দুই বছর না যেতেই সেই অবস্থান থেকে সরে এসে সরকার আবার পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়নের দিকে ফিরছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক সভায় ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে বাস্তবায়নের জন্য পরিমার্জিত মূল্যায়ন নির্দেশিকা অনুমোদন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) শাহানা সারমিন নতুন সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে যেসব বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক সহায়িকা রয়েছে—সেসব বিষয়ে মূল্যায়নের ৫০ শতাংশ হবে ধারাবাহিক এবং ৫০ শতাংশ হবে সামষ্টিক। তবে যেসব বিষয়ে কেবল শিক্ষক সহায়িকার মাধ্যমে পাঠদান হয়, সেসব বিষয়ে শতভাগ ধারাবাহিক মূল্যায়ন বহাল থাকবে। অর্থাৎ বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো মূল বিষয়ে লিখিত পরীক্ষা হবে, আর শিল্পকলা ও অন্যান্য সহপাঠ কার্যক্রমে থাকবে পর্যবেক্ষণভিত্তিক মূল্যায়ন।
তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে মূল্যায়নের কাঠামো আরও পরীক্ষানির্ভর করা হয়েছে। এসব শ্রেণিতে পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক বিষয়ে ৩০ শতাংশ ধারাবাহিক এবং ৭০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন কার্যকর হবে। তবে এখানেও সহপাঠ বিষয়গুলোতে শতভাগ ধারাবাহিক মূল্যায়ন থাকবে।
নতুন ও পূর্ববর্তী মূল্যায়ন কাঠামোর তুলনা নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো—
| শ্রেণি | বিষয়ভিত্তিক ধরন | ধারাবাহিক মূল্যায়ন | সামষ্টিক মূল্যায়ন |
|---|---|---|---|
| প্রথম–দ্বিতীয় | পাঠ্যপুস্তকযুক্ত | ৫০% | ৫০% |
| প্রথম–দ্বিতীয় | সহপাঠ বিষয় | ১০০% | নেই |
| তৃতীয়–পঞ্চম | পাঠ্যপুস্তকযুক্ত | ৩০% | ৭০% |
| তৃতীয়–পঞ্চম | সহপাঠ বিষয় | ১০০% | নেই |
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বছরে তিনবার সামষ্টিক মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়—এপ্রিল, আগস্ট ও ডিসেম্বর মাসে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি বিদ্যালয় নিজ উদ্যোগে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করবে। প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী একাধিক বিদ্যালয় যৌথভাবে প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারবে। সামষ্টিক মূল্যায়নের প্রশ্নের অন্তত ৩০ শতাংশ পাঠ্যপুস্তকের অনুশীলন থেকে নিতে হবে।
তবে এ সিদ্ধান্তের সমালোচনাও রয়েছে। প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার গঠিত পরামর্শক কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ মনে করেন, ছয়-সাত বছরের শিশুদের ওপর পরীক্ষার চাপ অযৌক্তিক। তাঁর মতে, শ্রেণিকক্ষে যথাযথ শিখন ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত না করেই পরীক্ষার মাধ্যমে ঘাটতি ঢাকার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিটি শিশুর সামর্থ্য অনুযায়ী শিখন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
দেশে বর্তমানে এক লাখ ১৮ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এত বড় ব্যবস্থায় মূল্যায়নপদ্ধতির যেকোনো পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের শিখনপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।