খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) জন্য এক যুগান্তকারী ও আকর্ষণীয় পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন থেকে কোনো প্রবাসী যদি তাঁর প্রচেষ্টায় দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বা ইকুইটি ক্যাপিটাল নিয়ে আসেন, তবে সেই বিনিয়োগের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে তাঁকে নির্দিষ্ট হারে নগদ প্রণোদনা দেওয়া হবে।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি, ২০২৬) রাজধানী তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) গভর্নিং বোর্ডের সভায় এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সভা শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এই উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে রেমিট্যান্সের ওপর প্রবাসীরা যেভাবে নগদ প্রণোদনা পান, নতুন এই ব্যবস্থাটিও অনেকটা সেরকম হবে। তবে এটি দেওয়া হবে কেবল শিল্প ও ব্যবসা খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে। প্রবাসীদের বিস্তৃত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও সামাজিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
প্রবাসীদের বিনিয়োগ সহযোগিতা ও প্রস্তাবিত প্রণোদনার সারণি:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও হার |
| প্রণোদনার ধরণ | নগদ অর্থ (ক্যাশ ইনসেনটিভ) |
| প্রণোদনার হার | ইকুইটি বিনিয়োগের ১.২৫ শতাংশ |
| বিনিয়োগের ধরণ | সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) বা ইকুইটি |
| লক্ষ্যমাত্রা | শিল্পায়ন ও ব্যবসায়িক মূলধন বৃদ্ধি |
| উদাহরণ | ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ আনলে ১২.৫০ লাখ ডলার প্রণোদনা |
| অবস্থান | চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন |
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আরও কাছে পৌঁছাতে বিডা বিদেশে নিজস্ব অফিস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথম পর্যায়ে চীনে বিডার অফিস খোলা হবে। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো একটি দেশে শাখা বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই অফিসগুলোতে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে চিরাচরিত সরকারি পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে না।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ জানান, বিদেশে নিয়োগপ্রাপ্তদের স্থায়ী বেতনের পরিবর্তে ‘কমিশন’ বা পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। অর্থাৎ, তারা দেশে যত বড় বিনিয়োগ আনতে সক্ষম হবেন, তাদের আয়ও তত বাড়বে। চীনের অফিসের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষা ও বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞ চীনা নাগরিকদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে।
বিনিয়োগ সেবা সহজতর করতে সরকার দেশের ছয়টি প্রধান বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাকে একীভূত করে একটি একক কাঠামোর আওতায় আনার রোডম্যাপ অনুমোদন করেছে। এই ‘সিঙ্গেল আমব্রেলা’ পদ্ধতির আওতায় বিডা, বেজা (BEZA), বেপজা (BEPZA), হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, পিপিপি (PPP) কর্তৃপক্ষ এবং বিসিক (BSCIC) একীভূত হবে।
বর্তমানে প্রতিটি সংস্থার প্রধান হিসেবে সরকার প্রধান থাকায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয় এবং বোর্ড সভাগুলো অনিয়মিত হয়ে পড়ে। নতুন এই কাঠামোর মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করতে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও এর কাঠামোগত পূর্ণ বাস্তবায়ন পরবর্তী সরকারের সময়ে হতে পারে, তবে বর্তমান সরকার এর নকশা ও আইনি ভিত্তি তৈরির কাজ সম্পন্ন করবে।
বিডার গভর্নিং বোর্ড সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকাও অনুমোদন করেছে। আগে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন না থাকায় কাজগুলো মন্থর ছিল। এখন থেকে কমিশন ভিত্তিতে পেশাদার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি অলাভজনক বা কৌশলগত সম্পদগুলো বেসরকারিকরণের পথ সুগম করা হবে।
সরকারের এই বহুমুখী উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশি মুদ্রার প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশেষ করে প্রবাসীদের কেবল অর্থ প্রেরক হিসেবে না দেখে ‘বিনিয়োগ দূত’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এটি শুধু দেশের রিজার্ভ বাড়াবে না, বরং বড় বড় আন্তর্জাতিক শিল্পগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলবে।