মনিরুজ্জামান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫
আজকাল কোন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াটা দাঁড়িয়েছে ফ্যাশন হিসেবে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণের খবর পেয়েই হৈ-হুল্লোয় মেতে উঠে শিক্ষার্থীরা। যেন কোন অসাধ্য সাধন করে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে। সেই আনন্দেই এত হৈচৈ।
বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) একযোগে সারাদেশে প্রকাশিত হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল। শিক্ষার্থীদের ফলাফলের তালিকায় দেখা যায় এগিয়ে আছে ছাত্রীরা, পিছিয়ে পড়েছে ছাত্ররা। কেন এমন বিপর্যয় তা অনুসন্ধানের বিষয়।
শিক্ষার্থীদের কাজই হচ্ছে পড়াশোনা করা। যে শিক্ষা গ্রহণ করে সে ছাত্র। আর যিনি শিক্ষা দান করেন তিনি শিক্ষক। একজন শিক্ষক কোন ধরনের শিক্ষাদান করবেন? যে শিক্ষা তিনি দান করবেন সে বিষয় সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত না হলে শিক্ষা দান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পাঠের বিষয় সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত হতে হলে প্রয়োজন সে পাঠ চর্চার। এই চর্চা যিনি করেন তিনিই ছাত্র। সেই হিসেবে বলা যায় শিক্ষকগণও ছাত্র। যিনি স্টাডি করেন তিনিই স্টুডেন্ট।
সক্রেটিসকে বলা হয় শিক্ষার আদি গুরু। তাঁর শিষ্যত্ব অর্জন করেছেন বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটো। প্লেটোই সর্বপ্রথম শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দাঁড় করিয়েছিলেন ‘একাডেমি’ নামে। তৎপরবর্তীতে তাঁর শিষ্যত্ব অর্জন করেছেন আরেক প্রখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল। তিনি ‘একাডেমি’র শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারিত করে গড়ে তুলেছেন ‘লাইসিয়াম’ নামক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে আমাদের যে শিক্ষা ব্যবস্থা তা প্লেটোর একাডেমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। বাহ্যিক দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটি দেখতে একই রকম হলেও পার্থক্য রয়েছে ভিতরগত দিকে। প্লেটোর একাডেমির কাজ ছিল মানুষ তৈরি করা। সেখানে অস্থির চিত্তকে শান্ত এবং সুঠাম দেহের অধিকারী করার জন্য ছিল সংগীত, ব্যায়াম থেকে শুরু করে নান্দনিক সকল শিক্ষা। ছিল না কেবল এক স্তর অতিক্রম করে অন্য স্তরে যাওয়া সময় তামসিকতা, হৈ-হুল্লোড়, চিৎকার-চেঁচামেচি।
প্লেটোর শিক্ষাব্যবস্থা তথা একাডেমির উদ্দেশ্য ছিল দার্শনিক রাজা তৈরি করা। যে ছাত্র একাডেমিতে সবগুলো স্তর অতিক্রম করতে পারবেন তিনিই হবেন দার্শনিক। আর এই দার্শনিকই হবেন রাষ্ট্রের কর্ণধার।
শিক্ষার্থীদের প্রথম এবং প্রধান কাজই হচ্ছে পড়াশোনা করা। পড়াশোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেই সে শিক্ষার্থী। শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থী তার নিজ স্তর অতিক্রম করে পরবর্তী স্তরে উন্নিত হবে। এই উন্নতির বিষয়টি আকাশ কুসুম নয় বরং স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। প্লেটোর একাডেমিতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীরা নিজ স্তরের শিক্ষা শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পরবর্তী স্তরে যেত। প্রত্যেক স্তরের সকল শিক্ষার্থী একই রকম হবে এমন কোন কথা নয়। প্রত্যেক শ্রেণিতে ভিন্ন প্রকৃতির শিক্ষার্থী থাকটাই স্বাভাবিক। কেউ দ্রুত নিজ স্তর অতিক্রম করবে কেউবা একটু সময় নিয়ে।
যে বিষয়ে শিক্ষার্থী অজ্ঞ সেই অজ্ঞতা কাটিয়ে তাকে পরবর্তী স্তরে পৌঁছাতে শিক্ষক শিক্ষা দান করেন। প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি যখন জ্ঞান সাগরে স্নান করেন স্নানান্তে তিনি জ্ঞান লাভের বিষয়টি ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যেমন সকলকে জানান দেন না তেমনি জ্ঞান সাগরের দিকে অগ্রসর হতে একটি শ্রেণি অতিক্রম করে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জানান দেওয়া নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।
পুঁজিপতিদের দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পায় এমন বীজ বপন করা হয় যা আড়াই বা তিন যুগ পর ফল দিয়ে থাকে। এই ফল তারা নিজেরা ভোগ করতে না পারলেও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম অবশ্যই ভোগ করবে এর বাইরে অন্য কেউ ফলে হাত দিতে পারে না।
আধুনিক যন্ত্রশিল্পের যুগে মানুষ অর্থের পেছনে অবিরাম ছুটছে তো ছুটছেই। প্রয়োজন হয়ে পড়েছে পাহাড় সম অর্থের। কিন্তু জীবন বাঁচাতে কতটুকু অর্থের প্রয়োজন? এমন প্রশ্ন আজ তাদের কাছে অবান্তর। পুঁজিবাদ এখানেই সফল।
বর্তমান পরিস্থিতি টলানো সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হাতে নিতে পারলেই ইচ্ছে অনুযায়ী পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব। অতিসূক্ষ্মভাবেই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে পুঁজিবাদীরা নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে যাচ্ছে। আমরা দেখেও দেখি না। বুঝেও বুঝি না। কথায় বলে ঠেকায় পড়ে শেখা। আমরা তখনই দেখতে পাব যখন ঠেকায় পড়ব। তখন আর কিছুই করার সুযোগ থাকবে না।
আমাদের সমাজের অধিকাংশ লোকই অবিরাম অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজের পরিবার সম্পর্কে অজ্ঞ। সকলেই আজ অর্থের মোহে ‘মানুষ হও’ এই নীতি বাক্য ভুলতে বসেছে। এই মোহই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে পরিবারের অভিভাবকদের। অভিভাবকদের পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণেই ছেলেরা পেয়েছে অবাধ স্বাধীনতা। করতে পারে ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো কাজ। ফয়েজ আহমদ ফয়েজ-এর লেখার ভাষ্যানুযায়ী, ‘এই স্বাধীনতা প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। এই স্বাধীনতার সকালে রাতের কামড়ে দেওয়ার দাগ রয়েছে।’
এইচএসসি পরীক্ষার পরবর্তীতে ছেলেরা যে সুযোগ পেত সেই সুযোগ এখন ষষ্ঠ কিংবা সপ্তম শ্রেণিতেই পেয়ে থাকে। ফলে অবাধে চলাফেরা করতে পারে মিশতে পারে যেকোনো শ্রেণির মানুষেদের সঙ্গে।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পরিবারের অভিভাবক পিতা। অর্থের মোহে লেলিহান পিতা তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় ছেলেরা হাতে পায় স্বাধীনতা আর মেয়েরা থাকে ঘরে মায়ের নজরে। মায়ের নজরে থাকে বিধায় যেকোনো সময় যেকোনো কাজ তারা করতে পারে না। প্রয়োজনীয় সকল শারীরিক ও মানসিক সাহায্য পায় মায়ের কাছ থেকে। ফলে একটা ধরাবাধার নিয়মের মধ্যদিয়েই তাকে এগিয়ে যেতে হয়।
মানবেতিহাসের আদিতে দল বা গোষ্ঠীর অধিকর্তা বা দলপতি ছিল নারী। প্রাকৃতিক বিবর্তন রূপান্তরের ধারায় ক্ষমতা বদলে তা চলে যায় পুরুষের হাতে। পুরুষ শাসিত এই সমাজে ক্ষমতার চূড়ায় বসে পুরুষ নিজেদের ক্ষমতাচ্যুত করার পথ তৈরি করছে কিনা এই প্রশ্ন অবান্তর নয়। দেখা যায় পড়াশোনা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা অগ্রসর। এর প্রকৃষ্ট নজির এবারের এইচএসসিতে পরীক্ষার ফলাফল।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই মানুষ এবং সকলেই সমান অধিকার ভোগ করবে এই আমাদের অঙ্গিকার। বলা যায় নারী এবং পুরুষ রেললাইনের মতো। যার একটি লাইন অপরটির পরিপূরক। একটি লাইন না থাকলে যেমন রেলগাড়ি চলতে পারে না তেমনি সমাজে নারী অথবা পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। এর একটি না থাকলে সমাজ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। ভারসাম্যহীন সমাজেই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। যা গোটা রাষ্ট্র এবং পৃথিবীকে প্রভাবিত করে থাকে।
জন্মের পর শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় তার মায়ের কাছ থেকে। তারপর তার পরিবারের লোকজনদের কাছে কথা বলা, আচার-আচরণ, সভ্যতা, ভদ্রতা, বিনয় প্রমুখ শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। তৎপরবর্তীকালে শিশু তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকেও নানান বিষয়াদি শিখে থাকে। যা তার পরবর্তী জীবন গঠনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে থাকে।
পরিবারের অভিভাবক যদি বিনয়ী, ভদ্র, সভ্য না হয় তবে তার সন্তানও একই রকম হবে। বর্তমানে স্কুল পড়ুয়া ছেলেদের যে অবস্থা সেই অবস্থা থেকে তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারে তাদের পরিবারের অভিভাবকগণ।
চঞ্চলমতি ছাত্ররা আজ পড়ার টেবিলে বসতে নারাজ। অভিভাবকদের হিমশিম খেতে হয় ছেলেদের পড়ার টেবিলে বসাতে। শিক্ষার্থীদের যদি পড়ার টেবিলে ফেরানো না যায় তাহলে জাতি ধ্বংসের দিকেই অগ্রসর হবে। কোন একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করাই যথেষ্ট।
লেখক, সাংবাদিক।